Thursday, March 31, 2016

নৈনিতাল থেকে সাততাল






মার্চের শুরু।শীতের দাপট কমে এলেও দিল্লী শহরে তার রেশ ভালোমতনই আছে। শৈলশহরগুলোয় পর্যটকদের মরশুম শুরু হতে তখনও মাসখানেক বাকী। এমনি সময়ে বিশেষ কাজে নৈনিতাল যাবার দরকার পড়ল ।আমি তখন লিম্কা বুক অফ রেকর্ডস্ এ সহ সম্পাদক। নৈনিতাল থেকে এক ভদ্রলোক গত কয়েক মাস যাবৎ ডজন দু তিন চিঠি লিখে তাঁর পরিবারের একটি বাতি বা ল্যাম্পের কথা জানাচ্ছিলেন যা নাকি একেবারে অভিনব। আমাদের সম্পাদক হঠাতই ঠিক করলেন যে আমাদের কারো সেটি স্বচক্ষে দেখে আসা দরকার। বই প্রেসে    যেতে দেরী নেই। অতএব এক্ষুনি যাওয়া চাই। নৈনিতাল আমার না দেখা। তাই আমিই যাবার অনুমতি চাইলাম। আমার এক লেখিকাবন্ধুও সঙ্গে যাবেন বললেন।


ওল্ড্ দিল্লী স্টেশন থেকে আমরা দুজনে রাত ১১টার সময়ে কাঠগুদামের ট্রেন ধরলাম। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। ট্রেনের কামরাও প্রায় খালি। পরদিন যখন কাঠগুদাম পৌছলাম তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট স্টেশন।কোথাও জনমানবের সাড়া নেই। এখান থেকেই পাহাড়ী পথ বেয়ে প্রায় ৬৪০০ ফিট উপরে নৈনিতাল যেতে হয় । অন্য সময়ে এখানে গাড়ীর ভীড় লেগে থাকে। কিন্তু জনমানব বিরল এই অসময়ে অনেক কষ্টে একটিমাত্র জীপের সন্ধান পাওয়া গেল। তাইতে করে আমরা পাড়ি দিলাম  অজানা পথে। রাস্তার একদিকে গভীর খাদ। অন্যদিকে জঙ্গল। গাছে গাছে ঘন সবুজের বিস্তার। নতুন পাতার সজীব ছোঁয়া তখনও লাগেনি তার গায়ে। পাহাড়ের উপরে ওঠার পর বিশাল নীল  দিগন্তবিস্তৃত লেকের প্রথম দর্শণ রীতিমত চমকপ্রদ।


নৈনিতালে হোটেলের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু বেশির ভাগই তখন খালি।   তাই  আমার স্বামীর অফিসের গেস্টহাউসে থাকাই আমরা স্থির করেছিলাম। জীপের শব্দ পেয়ে কেয়ারটেকার চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। এসেই খবর পেলাম যে হবু রেকর্ডকারী মেসেজ রেখে গেছেন যে আমরা যেন সূর্যাস্তর পরেই তাঁর বাড়ি যাই কারণ দিনের আলোয় বাতির বিশেষত্ব বোঝা যাবে না। ভালই হল। তাড়াতাড়ি স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম নৈনিতাল   শহর দেখতে।
  

গেস্টহাউস থেকে লেক মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। চারদিক স্তব্ধ নির্জন। লেকের জলের গভীর নীলিমা আকাশের নীলের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। জলের  বুকে  একটিমাত্র নৌকো। তাতে     মাঝি ছাড়া একজনই যাত্রী। হয়তো আমাদেরই মত হঠাৎ এসে পড়া কেউ। লেকের পাড় ঘেঁষে অজস্র উইপিংউইলো গাছ, তার পাতায় ভরা ডালগুলো জল ছুঁয়ে আছে।লেক পরিবেষ্টন করে রয়েছে দুটি পথ। একটি সরু পথ জলের একদম কাছাকাছি। অন্য রাস্তাটি কিছুটা উপরে। সেটি অনেক বেশী চওড়া আর  সুন্দর। পরে জানলাম যে বৃটিশ আমলে এই পথটি ছিল শুধুই গোরাদের জন্য। স্থানীয় লোকেদের এই পথে চলার অনুমতি ছিল না।
  

লেকের অন্যদিকে নয়নাদেবীর মন্দির। সেখান থেকে ঘন্টার শব্দ ভেসে আসছিল। নৈনিতাল পীঠস্থানের মধ্যে অন্যতম। দক্ষযজ্ঞের পর শিবের তান্ডবনৃত্যের ফলে সতীর দেহের বিভিন্ন অংশ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাঁর চোখ দুটি এসে পড়েছিল এইখানে। সেই নয়ন থেকেই “তাল” বা সরোবরের সৃষ্টি, তাই এখানকার নাম হয় নৈনিতাল। দেবীর স্থানীয় নাম তাই নয়নাদেবী বা নৈনিদেবী। 
 তবে পীঠস্থান হলেও নৈনিতাল শৈলাবাস হয়ে ওঠার আগে খুব কম লোকই এখানে আসত। তার  প্রধান কারণ পাহাড়ী রাস্তার দু্র্গমতা। কুমায়ুঁ পর্ব্বতমালার বুকে লুকিয়ে থাকা এই লেকের কথা খুব কম লোকই জানতো।
  
অজ্ঞাত নৈনিতালের শৈলশহর হয়ে ওঠার কাহিনী রীতিমত নাটকীয়।
সেটা উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক। ভারত তখন বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম কলোনী। ইংরেজরা অনেকেই সপরিবারে ভারতে এসে পড়লেও এখানকার গরম আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। তাই তারা তখন গড়ে তুলছে একটির পর একটি শৈলাবাস-  প্রথমে সিমলা, তার পরে মুসৌরী। ১৮৩৯  সালে ব্যারন নামে জনৈক ইংরেজ ব্যবসায়ী আলমোড়া পাহাড়ে বেড়াতে এসে  হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেললেন। অজানা, অচেনা পথে ঘুরতে ঘুরতে  আচমকা এসে পড়লেন পাহাড়ের কোলে বিশাল     লেকের প্রান্তে। তার চারিধারে ওক, সাইপ্রাস আর উইপিংউইলোর বন, তারা গিয়ে মিশেছে সুদূর পাহাড়ের গায়ে।  কি সুন্দর শান্ত পরিবেশ! ব্যারনসাহেব তক্ষুনি মনস্থির করে  ফেললেন যে  চিনির ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে এখানে ইংরেজদের জন্য নতুন   একটি শৈলশহর তৈরী করবেন। চারদিক ভালো করে ঘুরে দেখে বুঝলেন যে এখানে রেসকোর্স আর ক্রিকেট খেলার মাঠও তৈরী করা চলবে। আর নৌকাবিহারের কথা তো বলাই  বাহুল্য।  ব্যারন  রীতিমতো অবাক হলেন এমন  একটি   লেকের মাঝে একটিও নৌকো না দেখে।
   
ফিরে   গিয়ে ব্যারন একেবারে আঁট ঘাট বেঁধে কাজে নামলেন। প্রথমেই নতুন জায়গার চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করলেন। তারপরে নৈনিতালে এসে ঘাঁটি গাড়লেন। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলেন যে লেকের চারদিকের সবচেয়ে সুন্দর আর লোভনীয় জমির মালিক হলেন নরসিং। সঙ্গে সঙ্গেই ব্যারন ভাব জমালেন তার  সঙ্গে। ব্যারনের একটি নৌকো ছিল। তিনি এক দিন নরসিংকে নৌকো চড়ার আমন্ত্রণ জানালেন। নরসিং যে সাঁতার জানেননা সেটা   ব্যারন কথায় কথায় আগেই  জেনে  নিয়েছিলেন। নরসিং বন্ধুর আমন্ত্রন উপেক্ষা করতে পারলেন না। এবারে ব্যারন তাকে লেকের মাঝখানে নিয়ে গিয়ে বললেন যে ভালো চাও তো এক্ষুনি তোমার সব জমি কম্পানীবাহাদুরের নামে লিখে দাও নয়তো এই লেকেই হবে তোমার সলিল সমাধি। এই বলে ব্যারন তার পকেট থেকে নোটবই আর কলম বার করে দিলেন। সেই নোটবুকে নরসিং জমির সব অধিকার ব্যারনকে হস্তান্তরিত করলেন নিতান্তই প্রাণের দায়ে।


লেকের ধারে সুন্দর সেই জমিতে ব্যারন সর্বপ্রথম নিজের বাড়ি তৈরী করে তার নাম দিলেন পিলগ্রিম্ কটেজ। সে বাড়ি আজও আছে কিন্তু তার চারপাশে এত নতুন বাড়ি উঠেছে যে না  জানলে খুঁজে পাওয়া মুশ্কিল।  তারপরে জোর কদমে বাড়ী তৈরী চলল। ১৮৪৫এর মধ্যেগড়ে উঠল আরো অনেক কটেজ আর ভিলা। তৈরী হল নতুন মিউনিসিপ্যালিটি। এল আর্মি ক্যান্টনমেন্ট। তৈরী হল গির্জা, হাসপাতাল,  ক্লাবহাউস্  আর বোট ক্লাব। ছুটি কাটাবার ছোট শৈলাবাস পাকাপাকি ভাবে শহরে পরিণত হল।শুধু তাই নয় নৈনিতাল হয়ে উঠল সবচেয়ে জনপ্রিয় ছুটি কাটাবার আস্তানা।  তবে বাড়ী করার জন্য ইংরেজরা বেছে নিল পাহাড়ের ঢাল আর স্থানীয় সবাইকে ঠেলে দিল লেকের পাড় ঘেঁষা জলা জমিতে।  নৈনিতাল লেক  ছাড়াও তখন চারপাশে ছোট বড় অজস্র  লেক ছিল যার সংখ্যা ছিল ৬৬রও বেশী। তাই ইংরজরা   তখন  নৈনিতালের  নতুন নামকরণ করেছিল "লেক ডিস্ট্রিক্ট অফ কুমায়ুঁ"। সেই লেকগুলির বেশীর ভাগই আজ লুপ্ত, মাত্র কয়েকটি ছাড়া।

আমরা ঠিক করলাম প্রথমেই জিম কর্বেটের বাড়ি গার্নি হাউস্ দেখতে যাব। নৈনিতালের কথা ভাবতে গেলে সব চেয়ে আগে তাঁ র কথা ও তাঁর "ম্যান ইটার্স অফ কুমায়ুঁ" র কথাই মনে আসে। জিম কর্বেটের জন্ম হয় ১৮৭৫ সালে এই নৈনিতাল শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন এখানকার পোস্টমাস্টার। কর্বেটের ছোটবেলা কাটে নৈনিতালের পাহাড় আর জঙ্গলে। তখনই  এখানকার লোকেদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে যা তাঁর স্বজাতিবর্গের শত বাধা নিষেধ সত্বেও অব্যহত ছিল। তিনি নিজে সামান্য রেল কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু নিজের স্বল্প বেতন থেকেই তিনি গরীব গ্রামবাসীদের যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। সে কথা এখানকার লোকেরা আজও ভোলেনি। গার্নি হাউস্ তাই নৈনিতালের দ্রষ্টব্যের মধ্যে অন্যতম।

গার্নি হাউস আয়ারপাট্টা পাহাড়ের উপরে। ওক, ফার, দেওদার আর পাইন বনের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা বেয়ে উঠতে হয়। আর  আছে রডোডেন্ড্রণ গাছ, কিছু ফুলও ফুটে আছে। মনে পড়ে গেল শেষের কবিতার "উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেন্ড্রণগুচ্ছ"। গার্নি জিম কর্বেটের বাবার নাম ছিল।। সেই বাড়ি এখন মিউজিয়াম। কর্বেটের ব্যবহৃত জিনিষপত্র সেখানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

এই  পাহাড়েরই  অন্য দিকে  ডরোথীস্ সীট। কোলেট নামের জনৈক ইংরেজ পাহাড়র চূড়ায় এই বেদীটি তাঁর মৃতা স্ত্রী ডরোথী্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তৈরী করেন। ডরোথীর মৃত্যু হয়েছিল এক বিমান দুর্ঘটনায়। এখান থেকে নৈনিতালের দৃশ্য অবর্ণনীয়। লোকে এটাকে টিফিন টপ বা ল্যান্ড্স্ এন্ডও বলে। আর দেখার আছে  বোটানিকাল গার্ডেন আর সেন্ট জনস্ চার্চ যা এই শহরের প্রাচীনতম ইমারতের অন্যতম।

পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে চলার পথে চোখে পড়ে খানিকটা বাঁধানো সমতল জমি যা এখানে "ফ্ল্যাটস্" নামে পরিচিত। ইংরেজদের শাসনকালে এটি প্যারেডের জন্য ব্যবহার হত। তা ছাড়া প্রতি রবিবার সকাল সন্ধ্যায় লোকে এখানে আসতো মিলিটারী ব্যান্ডের বাজনা শোনার জন্য। পরবর্তীকালে বহু হিন্দী ফিল্মের শুটিং এখানে হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৬০র দশকে। এখন এটা প্রধানতঃ খেলার জন্য ব্যবহার হয়।

লেকের ধারেই রয়েছে ইংরেজদের স্থাপনা করা বোট ক্লাব। এখনও এখানে প্রতি জুন মাসে Kingfisher Yachting Compitition হয়, যা দেখতে পর্যটকদের বিশেষ ভীড় হয়।  এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল যে বৃটিশ আমলে এই ক্লাবে ইংরেজ ছাড়া আর কারো ঢোকার অনুমতি ছিল না কিন্তু ইরেজ হওয়া সত্বেও সামান্য পোস্টমাস্টারের ছেলে বলে এখানে জিম কর্বেটের প্রবেশাধিকার ঘটে নি । বংশকৌলীন্য এমনই জিনিষ!

নয়না পীক্ বা চীনা পীক্ নৈনিতালের সর্বোচ্চ শিখর, যার উচ্চতা ৮,৫৬৮ ফিট। এখান থেকেও যেমন সুন্দর হিমালয়ের দৃশ্য, তেমনি অনুপম নীচের শহরের দৃশ্য। দূরে চোখে পড়ে হনুমানগড়্হী। সেখান থেকে সূর্যাস্তের শোভা নাকি অসাধারণ। সময়াভাবে আমাদের আর সেখানে যাওয়া হল না। এবারে হবু রেকর্ডকারীর বাড়ি গিয়ে তার বংশের প্রাচীন আলো দেখার পালা।

কাজ শেষ করে পরিশ্রান্ত অবস্থায় গেস্টহাউসে ফিরেই শুনলাম যে আমার বন্ধুকে তখনই তার    আত্মীয়ের বাড়ি চলে যেতে হবে, কাল সকালের আগে তার ফেরা হবে না। যাক, কি আর করা। সকাল সকাল শুয়ে পড়লেই হবে। কিন্তু সেটা আর হল না। কারণ শুনলাম যে আমার স্বামীর অফিসের দুজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। নানা কথার পর চলে যাবার সময় তাঁদের মধ্যে একজন আমায়
বললেন, "ম্যাডাম,  আপ বহুত হিম্মতওয়ালী হ্যাঁয়"
"কেন বলুন তো?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
" এই   নির্জন এলাকায় একদম একা থাকছেন তো......."
"একা হবে কেন, কেয়ারটেকার তো আছে"
"সে তো বিকেল পাঁচটার মধ্যেই কাজ সেরে নিজের গ্রামে ফিরে যায়"

মনে পড়ল যে কেয়ারটেকার বলেছিল বটে যে পাঁচটার মধ্যে রাত্রের খাবার করে হটকেসে রেখে দেবে। কিন্তু চলে যাবার কথা কিছু  বলেনি  তো!
বললাম, "একটু ওপরেই তো পোস্টঅফিস। পোস্টমাস্টার তো আছেন সেখানে।"
"তিনি তো আজ বিকেলেই সপরিবারে দিল্লী গেলেন।"
একটু থতমত খেয়ে বললাম, "পোস্টঅফিসে রাত্রে দারোয়ান থাকে না?"
"তা থাকে। তবে কিনা......হেঁহেঁ........সন্ধ্যার পর থেকে তো সে......হেঁহেঁ........মানে, আপনি ঠিকমতো দরজা টরজা বন্ধ করে নেবেন আমরা চলে গেলেই।" 
যাঃ বাবা!

বাইরে ঘন অন্ধকার। লেকের ও ধারে পাহাড়ের   গায়ে  কয়েকটি    আলো টিম টিম করে জ্বলছে।   কোথাও জনমানবের সাড়া নেই। রীতিমত গা ছম ছম করা অনুভূতি!
তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় বসতেই টিভির   দিকে চোখ পড়ল। যাক  টিভি দেখে খানিকটা  সময় কাটানো যাবে। কারণ ঘুম তখন বহু  দূর! কেবল্ নেই, শুধুই দূরদর্শন। সেখানে  তখন রবিবারের ফিল্ম চলছে। টিভি খুলতেই দেখি জলার ধারে এক পোড়ো বাড়ি, তার সামনে কঙ্কালের হাত নেড়ে এক ছায়ামূর্তি বলছে, "যুগ যুগান্ত ধরে আমি তোমারই রক্তের লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছি"। কি সর্বনাশ! টিভিতেও এই! তাড়াতাড়ি টিভি বন্ধ করে   কম্বলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।  নিশুতি রাতে বাইরের ধপ ধপ শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল কার যেন পায়ের আওয়াজ। দূরে পাইন বনে হাওয়ার শব্দ যেন কার দীর্ঘশ্বাস! কোন রকমে জেগে ঘুমিয়ে রাত কেটে গেল।

সকালবেলার ঝলমলে রোদে সবটাই খুব হাস্যকর মনে হল। ততক্ষণে কেয়ারটেকার এসে ব্রেকফাস্ট তৈরী করে ফেলেছে। স্নান সেরে তৈরী হতে হতে আমার বন্ধুও এসে পড়ল। সারা দিনের জন্য ট্যাক্সি ঠিক করাই ছিল, বাকী দর্শনীয় জায়গা দেখার পর আমাদের রাত্রের আগেই কাঠগুদাম পৌছে দেবে  ফেরার ট্রেন ধরার জন্য।

অন্যান্য লেক পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ার আগে কিছু সুভেনীর কিনতে হবে। দু একটি সরকারী দোকান সারা বছরই খোলা থাকে। সেখানে স্থানীয় উলের বোনা সুন্দর শাল, স্কার্ফ আর সোয়েটার রয়েছে। আর রয়েছে বেশ কিছু হাতের কাজ আর   কাঠের  জিনিষ । আগেই শুনেছিলাম যে নৈনিতালর বিশেষত্ব হল মোমবাতি। আমরা সোজা মোমবাতির কারখানায় চলে গেলাম।   তার লাগোয়া শো রুমে কত রকমের, কত রং আর আকারের মোমবাতি। চোখে না দেখলে  কল্পনা করা যায় না। মোমের তৈরী বাড়ি, গির্জা, গাছ, জন্তু, জানোয়ার, পাখি, শিকারী, নর্তকী আরো কত কি আর কি তার রঙের বাহার! আমরা দুজনে এক ঝুড়ি মোমবাতি কিনে ফেললাম।

এবারে আমরা রওনা দিলাম ভীমতালের পথে। ভীমতাল নৈনিতাল থেকে ২৩ কিমি দূরে  এক বহু প্রাচীন   জনপদ। কিংবদন্তী বলে যে পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময়ে ভীম দ্রৌপদীর জন্য এই সরোবর থেকে পদ্মফুল  তুলে এনে দিয়েছিলেন তাই ভীমের নাম জড়িয়ে আছে এই সরোবরের সঙ্গে। এটিও নৈনিতাল লেকের মতই বিশাল। তার মাঝখানে একটি  দ্বীপ। নৌকো করে যেতে হয়। এখানকার লেক রিসর্টটি বিশেষ জনপ্রিয়। কয়েকটি রেস্তোরাঁও রয়েছে খোলা আকাশের নীচে। আমরা তার একটিতে চা খেতে বসে গেলাম, সঙ্গে গরম পকৌড়া।   ভীমতালে একটি ছোট ফোক্ কালচার মিউজিয়াম আছে। সেখানে পুরোনো দিনের  নানা অস্ত্রশস্ত্র , মূর্তি, গয়না, ও আরো নানা রকমের জিনিস রাখা আছে।

ভীমতাল থেকে ১৩ কিমি দূরে আর একটি সুন্দর লেক যার নাম হল নৌকুচিয়াতাল যার মানে হল ন'টি কোনা ওয়ালা তাল বা সরোবর। লোকে বলে যে লেকের নীচে একটি  নির্ঝর বা spring রয়েছে   যার থেকে এই লেকের সৃষ্টি। অনেকের মতে এটিই উত্তরাঞ্চলের সব চেয়ে মনোরম সরোবর। তার প্রধান কারণ, এখানকার  পরিবেশ এখনও শান্ত, স্তব্ধ ও নির্জন।  ওক আর পাইন ঘেরা এই লেক শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে।   এক দিকের পদ্মবনে ভ্রমরের মেলা তপোবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। নৌকুচিয়াতাল সম্পর্কে একটি মজার জনশ্রুতি আছে। যদি কেউ একই সঙ্গে এই লেকের ন টি কোনা দেখতে পান তাহলে তাঁর সর্ব মনোকামনা  পূর্ণ হবে। বলাই বাহুল্য আমরা অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই লেকের ন টি কোনা একসঙ্গে দেখতে    পেলাম না। সেটা বোধহয় এক হেলিকপ্টারে ছাড়া দেখা সম্ভবও নয়।

এবারে সাততাল, তার পরেই ফিরে যাবার পালা। সাততাল হল ভীমতাল থেকে ১৩ কিমি দূরে, প্রায় ৪,০০০ ফিট উঁচুতে ওক আর পাইন বনের মাঝে সাতটি লেকের সমষ্টি। ভীমতালের মতই সাততালের কাহিনী রামায়ন আর মহাভারতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বনবাসের সময় শুধু যে রাম আর সীতা এখানে  পদার্পণ করেছিলেন তাই নয়, রাজা নলের ছোট ভাই পুষ্কর যখন নলকে রিক্ত ও নিঃস্ব অবস্থায়  তাড়িয়ে দেয় তাঁর রাজ্য থেকে, তখন নল আর দময়ন্তীর জীবনের বেশ কিছু বছর কেটেছিল এই সাততালে। অন্ততঃ কিংবদন্তী তাই বলে। সাততালের নামও তাই তাদের নামে - রামতাল, লক্ষ্মণতাল, সীতাতাল, নলতাল, দময়ন্তীতাল, গরুড়তাল আর শুখাতাল। 

লেকগুলো সবই পরস্পরের সঙ্গে জোড়া। বর্ষার পরে সব গুলোই জলে টলমল করে। শহর থেকে অনেকটাই দূরে বলে ভীড়ের ছোঁওয়া এদের সৌন্দর্য্য নষ্ট করতে পারেনি। সাধারণ পর্যটকরা এত দূরে আসে না। যারা আসে তারা প্রকৃতির  অনাবিল শান্তি উপভোগ করতে অথবা প্রাণী আর উদ্ভিদজীবনের (পাখি, প্রজাপতি, মাছ , গাছপালা ইত্যাদির) পর্যাবেক্ষণ করতে আসে।    শুনলাম  এখানে  নাকি প্রায় ৫০০ রকমের পাখী ( তার মধ্যে অনেক গুলো বিশেষ ঋতুতে আসে ) ২০ রকমের জন্তু জানোয়ার, ৫২৫ রকমের প্রজাপতি, ১১,০০০ ও বেশী কীটপতঙ্গ  আর বহু রকমের মাছ দেখতে পাওয়া যায়। এখানে ক্যাম্পিং এর ব্যবস্থাও আছে। আর দ্রষ্টব্যের মধ্যে আছে বাটারফ্লাই মিউজিয়াম যা সত্যিই দর্শনীয়। ফ্রেডরিক স্মেটাচেকের স্থাপনা করা এই মিউজিয়ামে ২৫,০০০ রকমের প্রজাপতি আর মথ রাখা আছে, আরো আছে ১১০০ রকমের কীটপতঙ্গ, যার সবই এই এলাকায় সংগ্রহকরা। ফ্রেডরিক এখানে "দি বাটারফ্লাই ম্যান" নামেই পরিচিত।

শুনলাম ওক বনের গভীরে সুভাষধারা নামে একটি ঝর্ণা  আছে। সমায়াভাবে আমাদের আর সেখানে যাওয়া হল না। সন্ধ্যার ছায়া নেমে আসছে। অন্ধকারে পাহাড়ী পথে গাড়ি চালানো নিরাপদ নয়। ইচ্ছা না করলেও এই নান্দনিক পরিবেশকে এবার বিদায় জানাতে হল। নীল আর সবুজের নয়নাভিরাম স্মৃতি মনের মধ্যে রেখে আমরা রওনা হলাম ফেরার পথে।


স্বপ্না দত্ত

অগ্নিতীর্থ রামেশ্বরম্






অক্টোবর  শেষ  হতে  সপ্তাহখানেক  বাকী।  আকাশে  বাতাসে  লেগে  আছে  পূজোর  রেশ। ভোরের  আলো  ফোটার  আগেই  আমরা  পণ্ডিচেরী  থেকে  রওনা  হলাম  রামেশ্বরমের  পথে।  সেতুপতি  সাম্রাজ্যের   অন্তর্গত  এই  ছোট্ট  দ্বীপটির  এক  দিকে  বঙ্গোপসাগর  আর  অপর  দিকে  ভারত  মহাসাগর।  পূবে  পুরী,  পশ্চিমে  দ্বারকা  উত্তরে  বদরীনাথ  আর  দক্ষিনে  রামেশ্বরমকে  “চারধাম”  বলেন  অনেকেই।  এই  চার  ধামের  মধ্যে  একমাত্র  রামেশ্বরমের আরাধ্য   দেবতা  হলেন  শিব।   অন্য     তিনটির  অধীশ্বর  বিষ্ণু।  কিন্তু  রাম     নিজে  বিষ্ণুর  অবতার  হওয়া  সত্ত্বেও  শিবের  পূজা  করেছিলেন  এই  রামেশ্বরমে।  তাই  এটি  শৈব  আর  বৈষ্ণব  দুজনেরই  পূণ্যভূমি।

পণ্ডিচেরী  থেকে  বেরিয়ে  ভিল্লুপুরম   পেরোতেই  পুরো  এক  ঘন্টা  লেগে  গেল।  কিন্তু  শহর  পেরোলেই    চমৎকার  ন্যাশনাল  হাইওয়ে।  গাড়ী  প্রায়  হাওয়ার   গতিতে  উড়ে  চলল।  চেয়ে  দেখলাম  স্পিডের  কাঁটা  ১০০  আর  ১১০র  মধ্যে  স্থির  হয়ে   আছে।  পথেই  ত্রিচীর  শ্রীরঙ্গম  আর  মাদুরাইর  মীনাক্ষীদেবীর  মন্দির  দেখার  লোভ  সম্বরণ  করে  এগিয়ে  চললাম  কারণ   সন্ধ্যার   আগেই  রামেশ্বরম  পৌঁছতে  হবে।  এবারে  একটি    বিশেষ  কারণে  সেখানে  চলেছি  যার  জন্য  কিছু  ব্যবস্থার  প্রয়োজন।  আমার  স্বর্গতা  মায়ের  বিশেষ  ইচ্ছা  ছিল  রামেশ্বরম  দর্শণ  করবার।  তাঁর  অন্তিম  সংস্কারও  যেন  গয়ার  পরিবর্তে  সেখানে  করা  হয়  সে  কথাও    তিনি  জানিয়েছিলেন।    নানা  কারণে  মায়ের      রামেশ্বরম    দর্শণ  সম্ভব  হয়  নি।  তাঁর  সেই  অপূর্ণ  সাধ  পূর্ণ  করার  জন্য  আজ  আমাদের  রামেশ্বরম  যাত্রা।

রামেশ্বরম  থেকে  ৭০ কিমি  দূরে   সমুদ্রের তীরে   অবস্থিত  দেবীপটনম  নামে   ছোট  একটি  গ্রাম।   কথিত    আছে  এখানেই  দেবী  দূর্গা  মহিষাসুরকে  বধ    করেছিলেন     আজ  তার  সাক্ষ্য  দিচ্ছে  একটি  বিরাট  পুকুর  যার  পাশে  রয়েছে  দেবী  দূ্র্গার  ছোট  একটি  মন্দির।  স্থানীয়  লোকেরা  তাঁকে  উলাকানায়কীআম্মা  নামে  পূজা  করে।  কাছেই  নবপাষাণম ।  রামেশ্বরমে  যাবার  আগে  লোকে  এখানে  আসে  পূর্বপুরুষদের  তর্পণ  করতে।   শোনা  যায়     সীতাহরণের  পর  রাম  প্রথমে  এখানেই  পদার্পণ  করেছিলেন  সেতু  কোথায়  বাঁধা  হবে স্থির  করার  জন্য।  উত্তাল  সমুদ্র  আর  শিলাময়  সমুদ্রতট  দেখে  তিনি  প্রথমে  নবগ্রহের  উপাসনা   করেন।    সাগরবেলা   থেকে  ন’টি  শিলা  কুড়িয়ে  এনে  রাম      সমুদ্রতটেরই   এক   প্রান্তে  নবগ্রহের স্থাপনা  করেন।    নবগ্রহ  অর্চনার  পর  তিনি  পূর্বপুরুষদের  তর্পণ  করে  সমুদ্রকে  শান্ত  হবার  জন্য  প্রার্থনা  জানান।  এখানে  সমুদ্র  আজও  দীঘির  মতই  শান্ত।  শুনলাম  সমুদ্রর    পারেই  শ্রীলংকা।  রামের  স্থাপনা  করা  এই  নবগ্রহ  বা  নবপাষাণে  লোকে  এখনও  তর্পণ  করতে  আসে।

 নব  পাষাণের  তিন  দিকে  নীচু  দেওয়াল  তোলা।  চতুর্থ  দিকে  খোলা  সমুদ্র।  নব  পাষাণ  তাই  সব  সময়ই  জলে  নিমজ্জিত  থাকে।  তবে  বছরের  অন্য  সময়  শুধু  হাঁটুজল  থাকে  তাই  তর্পণের   সময়  নবগ্রহদের   স্পর্শ  করা  যায়।  কিন্তু  তখন  সময়টা  বর্ষার  ঠিক  পরেই  বলে   দেখা  গেল   ন’টির  মধ্যে  চারটি  শিলাই  জলের  নীচে,  পাঁচটি  মাত্র  দেখা  যাচ্ছে।

এখান  থেকে  খুব  কাছে  হাজার  বছরেরও  বেশী  পুরোনো  জগন্নাথের    মন্দির।  লোকে  বলে  এই  মন্দিরে  নাকি  পুত্রহীন  রাজা  দশরথ  এসেছিলেন   তনয়লাভের  জন্য  প্রার্থনা  জানাতে,   পুত্রেষ্ঠী  যজ্ঞ  করাবার  আগে।  এখনও  এখানে  বহু  সন্তানহীন  দম্পতি  পূজো  দিতে  আসেন।  নব  পাষাণে  তর্পণ  করতে  চাইলে  এই  মন্দিরের  পূজারী   তার  ব্যবস্থা  করে  দেন।   নব  পাষাণের  কাছে  গিয়ে  দেখলাম  যে  ইচ্ছা    থাকলেও  কাছে  গিয়ে  তর্পণ  করা  যাবে  না  কারণ  সেখানে   আমাদের  বুকজল।   আমরা  হাঁটুজলে  নেমে  দাঁড়ালাম।  পুরোহিত  কাছে  গিয়ে  নবগ্রহ  স্পর্শ  করে  আমাদের  মন্ত্রপাঠ  করালেন।

এবার  পাড়ি  দিলাম  রামেশ্বরমের  পথে।  পেম্বান  স্ট্রেটের উপর  দিয়ে  লম্বা  ব্রীজ  পেরিয়ে  রামেশ্বরম  দ্বীপে  যেতে  হয়।  সমুদ্রের  উপরে  সেতু  পেরোনো  রীতিমত  গা-ছম ছম-করা  অনুভূতি।  পাশেই  অনেকটা  নীচে  ১০০ বছরেরও  বেশী  পুরোনো  রেলওয়ে  ব্রীজ।  তার  উপর  দিয়ে  ছোট   রেলগাড়ী    গুটিগুটি  চলেছে।  সূর্যাস্ত  হয়  হয়।  শান্ত  নীল  সমুদ্রের      জলে  লেগেছে  গাঢ়  লালের  ছোঁওয়া।  তারি  মাঝে  অজস্র  মাছ-ধরা  নৌকো  নোঙর  ফেলে  স্থির  হয়ে  দাঁড়িয়ে। 

এবার  আমরা  রামেশ্বরমে  ঢুকলাম।  এই  রামেশ্বরম  রামায়নের  চেয়েও  প্রাচীন।   তাই   চারিদিকে   রাম,  সীতা,   হনুমান  আর   রামায়নের  নানা  চরিত্রের  অনেক  সুখদুঃখের  কাহিনী  ছড়িয়ে  আছে  যা  আজও  লোকের  মুখে  মুখে  ফেরে।

প্রথমেই  মনে  প্রশ্ন  জাগে,  এই  তীর্থর  নাম  অগ্নিতীর্থ  কেন।   শুনলাম        রাবণবধ  আর  লংকা  বিজয়ের  পর  রাম  লক্ষ্মণ    সীতাসহ    ফিরে  এসেছিলেন    এই  রামেশ্বরমে।  রাম  তখন  সীতাকে   বলেন  যে  স্বামী  হিসেবে,   রাজা    হিসেবে    এবং   ক্ষত্রিয়  হিসেবে   রাবণের   হাত   থেকে   তোমাকে   উদ্ধার  করা   আমার   কর্তব্য  ছিল,   তা   আমি    পালন    করেছি।        কিন্তু   তোমাকে   স্ত্রী  বলে  গ্রহণ  করা  আর  আমার  পক্ষে  সম্ভব  নয়।   অভিমানিনী    সীতার   মনে  হল   যে    কথা  শোনার   পর   তাঁর  বেঁচে   থাকটাই   অর্থহীন। তিনি   লক্ষ্মণকে  সমুদ্রতটে  তাঁর   জন্য  চিতা  সাজাতে  বললেন।   সেই  জ্বলন্ত  চিতায়   ঝাঁপ    দেওয়া  সত্ত্বেও   কিন্তু  আগুণ  তাঁকে   স্পর্শ  করল  না।  স্বয়ং  অগ্নিদেব  আবির্ভূত  হয়ে  সীতাকে   রামের   কাছে   ফিরিয়ে  দিয়ে   বললেন   যে   সীতার   পবিত্রতা  সম্পর্কে  সন্দেহ  করার   কোন  কারণ   নেই।   এতদিন  ধরে   রাবণের   গৃহে  বন্দী  থাকার   দরুণ   যদি   কোন  অপরাধ   তাঁকে   স্পর্শ  করেও   থাকে ,  সেই   অনিচ্ছাকৃত  অবস্থানের  অপরাধ টুকুও   অগ্নিদেবের  আশীর্বাদে  নিশ্চিহ্ন  হয়ে    গেছে।  রাম  তখন  সানন্দে  সীতাকে   গ্রহণ  করলেন।   সেই  থেকেই   এই  সমুদ্রতট  পূণ্যভূমি   অগ্নিতীর্থ  নামে  পরিচিত   হল। 

কিন্তু  এখানেই   কাহিনীর    শেষ  নয়।    এই  ঘটনার   একটু  পরেই  সেখানে   এসে    উপস্থিত   হলেন   অগস্ত্য  মুনি।   তিনি   রামকে   বললেন  যে   লংকা  বিজয়ী   হলেও    রাবণ কে  বধ  করার  দরুণ   রাম  ব্রহ্মহত্যার  পাপে   পাপী।    রাবণের   আচরণ   যতই  নিন্দনীয়  হোক  তিনি   ঋষিপুত্র   ছিলেন।  অগস্ত্য  আরো  বললেন  যে  এই  পাপ  থেকে   মুক্তি  পেতে  হলে  তাঁকে  শিবের   পূজো  করতে  হবে।  কিন্তু  এই  ছোট্ট  নির্জন  দ্বীপে  শিবলিঙ্গ  কোথায়?   রাম   হনুমানকে   কৈলাশে   পাঠা লেন  শিবলিঙ্গ  নিয়ে  আসার  জন্য।   কিন্তু    হনুমানের   আর  ফেরার  নাম  নেই।  এদিকে  সময়  বয়ে  যায়।   নির্দিষ্ট  সময়ের  মধ্যে    পূজো   সম্পন্ন  হওয়া   চাই।  তখন  সীতা  সমুদ্রের  বালি  দিয়ে  শিবলিঙ্গ  গড়ে  দিলেন।  রাম  সমুদ্রে  স্নান  করে  পূজোয়  বসলেন।  পূজো  সবে  শেষ  হয়েছে   এমন  সময়  হনুমান   কৈলাশ    থেকে  শিবলিঙ্গ  নিয়ে  ফিরে   এলেন।  

রামের  পূজো  শেষ  হয়ে  গেছে  দেখে  হনুমানের   খুব  অভিমান  হল।  সীতা  তখন   হনুমানকে  সান্ত্বনা  দিয়ে  বললেন,   আমার   গড়া  এই  শিবলিঙ্গ  তো  বালির  তৈরী।  এখনই  ভেঙে  যাবে।  হনুমান  সগর্বে  বললেন,  আমার  ল্যাজের  একটি  ঝাপটাতেই   ওটি  চূরমার   হয়ে  যাবে।  কিন্তু  এক  ঝটকা  তো  দূরের  কথা  আপ্রাণ  চেষ্টা  করেও  হনুমান  বালির  সেই  শিবলিঙ্গ  এক  চুল  নড়াতে  পর্যন্ত  পারলেন  না।  নিজের  ভুল  বুঝতে  পেরে  হনুমান  তখন  সীতার  পায়ে  ধরে  ক্ষমা  চাইলেন।  আর  রাম  বললেন  যে  দুটি  শিবলিঙ্গই  এখানে  পাশাপাশি   থাকবে।  আমি  পূজো  করেছি  বলে  প্রথমটির  নাম  হবে  রামালিঙ্গম।  আর  কৈলাশ  থেকে  আনা  তোমারটির  নাম  হবে  বিশ্বলিঙ্গম ।  তবে   আমার  আদেশে  সব  সময়  আগে  পূজো  হবে  বিশ্বলিঙ্গমের।

রামেশ্বরমের  মন্দির  এই  যুগল    শিব লিঙ্গের   উপর  প্রতিষ্ঠিত। এই  মন্দিরকে  সবাই  রামনাথস্বামীর  মন্দির  বলে।  বহু  শতাব্দী  ধরে  রামেশ্বরম  সেতুপতি  সাম্রাজ্যের  অন্তর্গত।    একড়  জমির  উপর  অবস্থিত  বিশাল  এই  মন্দির  তাদেরই  তৈরী।   এত  বড়   মন্দির  ভালোভাবে  দেখতে  অনেক    সময়  লাগবে  বলে  আমরা  প্রথমে  বিবেকানন্দ  মণ্ডপম  দেখতে    চলে   গেলাম।   এই  মন্দির  পরে  সময়  নিয়ে  দেখা  যাবে 

অনেকেরই  হয়তো  জানা  নেই  যে  স্বামী  বিবেকানন্দের  শিকাগো  যাত্রায়  সেতুপতি  ভাস্করের  (যিনি  রাজা  রামনাড  নামেও  পরিচত)   অনেকখানি    অবদান   ছিল।  স্বামীজী  স্থির  করেছিলেন   যে  শিকাগো   থেকে  দেশে  ফেরার   পথে  তিনি  এখানেই  প্রথম  পদার্পণ  করবেন।  কলম্বো  পর্যন্ত  জাহাজে    এসে,  সেখান  থেকে  স্টিমারে  করে  তিনি  যখন  রামেশ্বরম  পৌছলেন   তখন  তাঁকে  স্বাগত  জানাতে  সেতুপতি  ভাস্কর  স্বয়ং  এসে  দাঁড়ান  সমুদ্রের  তীরে।  সেখানে  হাঁটু  গেড়ে  বসে  তিনি  স্বামীজীর  কাছে  প্রার্থনা  জানান  যে  তিনি  যেন  মাটিতে  পা  রাখার  আগে  তাঁর  ওপরে  আগে  পা  রাখেন।  স্বামীজী  ভাস্করের  এই  অনুরোধ  না  রাখলেও  তার  আতিথ্য  সানন্দে  স্বীকার  করে  তিন  দিন  রামেশ্বরমে  ছিলেন । সেই  থেকে  এই  জায়গার   নতুন  নাম  হল  কুন্দুকাল,  অর্থাৎ  যেখানে   (সেতুপতি )  নত  হয়েছিলেন    এখানেই   তিনি  একটি   স্মারক  বা  মণ্ডপম  স্থাপনা  করেন।   এটি  সমুদ্র  থেকে  মাত্র  কয়েক  গজ  দূরে,   সমুদ্রতটের  উপরেই  তৈরী।  

রামেশ্বরমে  থাকাকালীন    স্বামীজী রামনাথস্বামী মন্দির  প্রাঙ্গনেও ভাষণ  দিয়েছিলেন।   সেই  সময়েই  তিনি  বলেছিলেন: 

“...... he who thinks, "I will get to heaven before others I will get Mukti before others" is the selfish man. The unselfish man says, "I will be last, I do not care to go to heaven, I will even go to hell if by doing so I can help my brothers." This unselfishness is the test of religion. He who has more of this unselfishness is more spiritual and nearer to Shiva. Whether he is learned or ignorant, he is nearer to Shiva than anybody else, whether he knows it or not. And if a man is selfish, even though he has visited all the temples, seen all the places of pilgrimage, and painted himself like a leopard, he is still further off from Shiva.”    

রামেশ্বরমে  স্বামীজীর  পদার্পণের  দিন  ছিল  ২৬ শে  জানুয়ারী ,  ১৮৯৭। 

দুর্ভাগ্যবশতঃ  আমরা   যখন  মণ্ডপমে  এসে  পৌঁছলাম   তখন  সেখানে   লোড  শেডিং  চলছে।  তবু  এমরজেন্সী  লাইটের   আলোয়  হলের  মাঝখানে  স্বামীজীর  বিশাল  মূর্তি  দেখে  ভাল  লাগলো।  হলের  এক  প্রান্তে  ঠাকুর  রামকৃষ্ণ    সারদা  মায়ের  বিরাট  ছবি।  বাকী  সব  দেওয়ালে   রয়েছে  স্বামীজীর নানা  সময়কার  ছবি।  আর  রয়েছে   ঠাকুর,  শ্রীমা  আর  স্বামীজীর  বাণী।   কিন্তু  সবই  তামিলে  লেখা,  অন্য  কোন  ভাষা  নেই।  একটু  আশ্চর্য লাগে  ঠিকই ।  তবুও   দক্ষিণের  এই  সুদূর  প্রান্তের  জন  সাধারণের    কাছে   ঠাকুর,  শ্রীমা  আর  স্বামীজী  এত  ভালবাসার   আর  কাছের  মানুষ  জেনে  সত্যিই  ভাল  লাগল।  শ্রীমাও  শশী  মহারাজের  সঙ্গে  রামেশ্বরমে  এসেছিলেন। 

শুনলাম  রামকৃষ্ণ  তপোবনম  ট্রাস্ট  নামের  একটি  স্বাধীন    সংস্থা  বিবেকানন্দ  মণ্ডপমের  দেখাশোনা    কাজ  পরিচালনা  করে।  অন্যান্য  অনেক  কাজের  মধ্যে  এরা  গ্রামবাসী, বিশেষ  করে  জেলেদের    ছেলেমেয়েদের    জন্য,  অনেকগুলি    স্কুল  চালায়।   রাত  হয়ে  গিয়েছিল।   পরদিন   সকালে   অনেক  কাজ ।  তাই  গেস্ট  হাউসে  ফিরে  এসে  তাড়াতাড়ি   খাওয়া  দাওয়া  সেরে  শুয়ে  পড়লাম।  এখানে  বহু  লোক  আসে  সারা  বছর  ধরে ,    সম্ভবতঃ  সেই  জন্যই  খাবার  জায়গাগুলোতে    দক্ষিণী  খাবার  ছাড়াও   অন্যান্য  খাবার  পাওয়া   যায়।

পরদিন  ভোরবেলায়   পৌঁছে  গেলাম   রামনাথস্বামীর  মন্দিরে।  মন্দিরের   এক  প্রান্তে  রয়েছেন  বিশালাক্ষী   দেবী।    তাঁর  বেদীর  পাশেই  স্ফটিকের     তৈরী    জ্যোতির্লিঙ্গম।       লোকে    বলে   লংকার   রাজা   হবার  পর  বিভীষণ  এসে  নাকি  এঁর  স্থাপনা  করেন।  এঁর  পূজো  আর  আরতি  হয়  খুব  ভোরে,   সূর্যোদয়ের  আগেই।   সে   এক  আশ্চর্য্য  অভিজ্ঞতা।  ভোরের  আলো  আর  মন্দিরের  প্রদীপ,  ধূপের  গন্ধ  আর  ফুলের  সৌরভ ,  তার  সঙ্গে  মন্ত্রধ্বনি  আর  কাঁসর- ঘন্টার  শব্দ  মিলে  এক  অনবদ্য  পরিবেশ   রচনা   হয়েছিল     মনে  পড়ে  গেল  এই  মন্দিরেরই  গর্ভগৃহে  রয়েছে  স্বয়ং  রামের   প্রতিষ্ঠিত    পূজিত  যুগল   শিবলিঙ্গ।  এই  পরিবেশে      হঠাৎ   যেন  ত্রেতা  যুগকে    খুব  কাছের  বলে  মনে  হল।  

এর পর  বর্তমানে  ফিরে  আসার  পালা।  অন্তিম  সংস্কার  করার  আগে  সর্ব  প্রথম  অগ্নিতীর্থের  সমুদ্রে  ডুব  দিতে  হয়।  বর্ষার  ঠিক  পরেই  বলে  বীচ  অথবা  সমুদ্রতট  বলে  কিছু  নেই।  মন্দিরের  চত্বর  থেকে  দু  পা  এগোলেই  রাস্তা। রাস্তার  কোল  ঘেঁষে  সোজা  সমুদ্র।  পা  দিলেই  হাঁটুজল।  দু  পা  এগোলেই   কোমরজল।   ভাগ্যবশতঃ  সমুদ্র  এখানে  খুবই  শান্ত। কিন্তু  উঁচু  ঢেউ  না  থাকলেও  জলের  চাপ  প্রচণ্ড-  সোজা  হয়ে  দাঁড়ানোই   মুশ্কিল।  ভোরের  সময়   হলেও    তখনই  সমুদ্রে  বহু  লোকের  মেলা।  অনেক  দূর  পর্যন্ত  বুকজল  কিন্তু  সাঁতার  না  কেটে  এগিয়ে  যাওয়া   সহজ  নয়।  এদের  মধ্যে  অনেকেই  পূণ্যার্থী।  আবার  অনেকে  এসেছে  নিছক  আনন্দ  করতে।  কয়েক  জনকে  জলের  মধ্যে  পড়ে  যেতেও  দেখলাম।  ডুব  দিতে  আমার  চিরদিনই   ভয়  কিন্তু    ক্ষেত্রে  তিনটি  ডুব  না  দিলেই  নয়।  কোনমতে   নিয়ম  রক্ষা  করে  তীরে  উঠে  এলাম।   সামনেই  শংকর  মঠ।  তার  প্রাঙ্গনে  কাজে র  ব্যবস্থা। সেটা  অগ্নিতীর্থে  ডুব  দেবার  পর  ভিজে  কাপড়ে  করা  নিয়ম। 

প্রয়োজনীয়  সামগ্রী     পুরোহিতের    ব্যবস্থা  আগে  থেকেই   করা  ছিল। পুরোহিত  আমাদের  দুজনকেই     কাজ   করতে   বললেন  । তার  কারণ , এই  অগ্নিতীর্থে তর্পণের  মাহাত্ম  নাকি  আলাদা ।   সংক্ষিপ্ত  অনুষ্ঠান,  কোন  বাহুল্য  বা  আড়ম্বর  নেই।  পুরোহিতের  স্পষ্ট  সংস্কৃত  উচ্চারণ  বুঝতে  কোন  অসুবিধা   হল  না।  সব  শেষে  আমাদের  দুজনের   বাবা - মা,  পিতামহ - পিতামহী, , মাতামহ  - মাতামহী    তাঁদের  চারজনের   পিতা    মাতাকে  স্মরণ  করে  বলা  হল,  “ হে  পূর্বপুরুষ    মাতৃকা গণ,   সীতার  স্পর্শধন্য  এই  অগ্নিতীর্থে  তোমাদের  সবার  জন্য  এই  তর্পণ  করা  হল । তোমরা  যে  লোকেই  এখন  অবস্থিত  হয়ে  থাকো , তোমরা  সবাই  পরিতৃপ্ত  হও” ।

শুনলাম   তার  পরেও  একটা  বিরাট  পর্ব  বাকী  যা  মন্দিরে  ঢোকার  আগে  শেষ  করতে  হবে ।  রামনাথস্বামীর  এই  বিশাল  মন্দির  প্রাঙ্গনে  ২২- টি  “তীর্থ”  রয়েছে।  সাবিত্রী  তীর্থ, গায়ত্রী  তীর্থ, সরস্বতী  তীর্থ,  মহালক্ষ্মী তীর্থ,  সূর্য  তীর্থ   চন্দ্র  তীর্থ  ইত্যাদি।    প্রতিটি  তীর্থের    প্রতীক  একটি  কুয়ো  অথবা  পুকুর।  অন্তিম  সংস্কারের  শেষে  এর  প্রত্যেকটির  জলে  আলাদা  করে  স্নান  করে  তবে  মন্দিরে  ঢোকা  নিয়ম।   এর  জন্য  আলাদা  লোক  রয়েছে ,  যাদের  কাজ  হল  কুয়ো  বা  পুকুর  থেকে  বালতি  করে  জল  তুলে  তর্পণার্থীদের  মাথায়  ঢেলে    দেওয়া ।  এই  নিয়মের  কথা  জেনে  আমাদের   চক্ষুস্থির!  কি  সর্বনাশ, একেই  তো  সমুদ্রে  ডুব  দেবার  পর  থেকেই  ভিজে  কাপড়ে   রয়েছি  তার  উপরে  আবার  ২২  বালতি  জলে  স্নান  করতে  হলে    নিমোনিয়া  না - ই  হোক  সর্দিকাশি  যে  হবেই  সে  সম্পর্কে  সন্দেহ  ছিল  না।  তবু ,   এত  দূর  এসে  তো  আর  পিছিয়ে  যাওয়া  যায়  না।  তাই  এটিকে  অ্যাডভেঞ্চার  মনে  করে  আমরা  মন্দিরের  ৭ - একড়   প্রাঙ্গনে  পুরো  ২২ টি  তীর্থ  ঘুরে  ৪৪ বালতি  জলে  (দু  জনে) স্নান  করে  ফেললাম     তাতে  প্রায়  ৪৫  মিনিট   সময়  লাগলো ।   আমাদের  মনের  অবস্থা  তখন  বনফুলের  “জঙ্গম”- এর  মত -
  “সমুদ্রে  পেতেছি   শয্যা,  শিশিরে  কি  ভয়” ।   কিন্তু  আশ্চর্যের  কথা  এই  যে  এত  কিছুর  পরেও  কারো  এতটুকু  শরীর  খারাপ  হয়  নি।  মন্দিরের  লোকেরা  বলেছিল  যে  পুণ্যস্নানে  কারো  নাকি  শরীর  খারাপ  হয়  না।   হয়তো  বা  তাই।

তীর্থের  জলে  স্নান  করার  সময়  একটুখানি    জল  খাওয়াও  নিয়ম।  দেখে  অবাক   হলাম  যে  প্রতিটি  তীর্থর  জলই  মিষ্টি,  সমুদ্রের  এত  কাছে  হওয়া  সত্ত্বেও  একটুও  নোনতা  স্বাদ  নেই।  শুনলাম   প্রতি  দিন  অজস্র  বালতি  জল  তোলা  সত্ত্বেও  তীর্থর  জল  কখনও  শেষ  হয় না  বা  শুকিয়ে  যায়  না।    শেষ  তীর্থের  সামনে  ছেলে    মেয়েদের  কাপড়   বদলাবার   দুটি  বিশাল  ঘর,  খুব  পরিস্কার  পরিচ্ছন্ন।  অবশেষে   শুকনো  জামা  কাপড়  পরে  এবার  মন্দিরের  ভিতরে  ঢুকলাম।  এই  মন্দিরের  গোপুরমও   দেখার  মত।  দ্রাবিড়  স্থাপত্যের  অপূর্ব  নিদর্শণ।  এখানকার  বিশেষ  দ্রষ্টব্য  হল  মন্দিরের  তিনটি  দালান   বা  করিডোর  যাকে  এরা  বলে  “প্রকার”।  তার  দু  ধারে  অনবদ্য  কারুকার্য্য  করা  খিলানের   সারী।  ১ . ২  কিলোমিটার   লম্বা  এই  দালান   পৃথিবীর   সবচেয়ে  লম্বা  pillared corridor   দুর্ভাগ্যবশতঃ  সিকিউরিটির   দরুণ   এখন  মন্দির  বা  তার  ভিতরের  ছবি   তোলা   বারণ। 

গেস্টহাউসে  ফিরে  খাওয়াদাওয়া    সেরে  আমরা  বেরিয়ে   পড়লাম  বাকী  দ্রষ্টব্য  দেখতে।  প্রথমেই  গন্ধমাদন  পর্বত  যার  উপর  থেকে  সারা  রামেশ্বরম  দেখতে  পাওয়া   যায়।  পথে  রয়েছে  কোদণ্ডরামা  মন্দির।  এইখানেই   বিভীষণ  রাবণের   পক্ষ  ছেড়ে  প্রথম  রামের  কাছে  আত্মসমর্পণ করেছিলেন।   লংকা  বিজয়ের   পর  এখানে  রাম  বিভীষণকে   লংকার   অধীশ্বর  ঘোষণা   করে  তাঁর  রাজ্যাভিষেক   করেন।  গন্ধমাদন  পর্বতের  উপরে  মন্দির।  কিন্তু  সেখানে  কোন  বিগ্রহ  নেই,   শুধু  একটি  চক্রের  উপরে   দুটি  চরণচিন্হ  রয়েছে।  রাম  যখন  প্রথম  এখানে   আসেন  তখন  এই  গন্ধমাদন  পর্বতের  উপর  থেকে  কোথায়  সেতু  বাঁধা  হবে  সেটা  ঠিক  করেছিলেন।   পরে  হনুমান  যখন  রামের  আংটি  নিয়ে  লংকায়   বন্দিনী  সীতার  কাছে  যান  তখন ও  তিনি  এখান  থেকেই  যাত্রা  শুরু  করেছিলেন।  

মন্দিরের  ছাত  থেকে  চারদিকের   দৃশ্য  তুলনাহীন।   চারদিকের    গাছপালার   নিবীড়   সবুজ   এসে  মিলেছে  সমুদ্রের  গাঢ়  নীলিমার   সঙ্গে।  তার  মাঝে  অতি  আধুনিক  টিভি  টাওয়ার   এই  পরিবেশে   কেমন  খাপছাড়া   লাগে।  অন্য  দিকে  গাছপালার   ফাঁকে  চোখে  পড়ে  বিরাট  বড়  বালির  চড়া।  শুনলাম   সেখানটা   নাকি  ফিল্মের   শুটিং - এর  জন্য  বিশেষ   জনপ্রিয়। 

আরো  কয়েকটি  মন্দির যার  সঙ্গে  রামায়ণের  কাহিনী  জড়িয়ে  আছে  এর  কছেই  রয়েছে     তার  মধ্যে  একটি  হল  ভিলুণ্ডি তীর্থম্ ।  এটিও   একেবারে  সমুদ্রের তীরে    ছোট  একটি  মন্দিরের  সঙ্গে  একটি  সেতু  যার  শেষে  রয়েছে  একটি  কূয়ো ।  রাম  যখন  তাঁর  বানর  সেনা  সহ  সীতার  খোঁজে  এখানে  এসে  পৌছলেন  তখন  দেখলেন  যে  কোথাও  খাবার  জল  নেই    এদিকে  তাঁর  পুরো  সেনানী  তৃষ্ণায়  কাতর ।  রাম  তখন  সমুদ্রের  তীরে  বাণ  মারলেন ।  তাই  থেকেই  এই  কূয়োর  সৃষ্টি ।  সেই  জলে    সবার  পিপাসা  মিটেছিল    কূয়োটি  পরে  নতুন  করে  বাঁধানো  হয় ।  সামান্য  নোনতা  হলেও  সেই  জল  আজও  খাওয়া  যায় ।  আর  আছে  সৎচি  হনুমান  মন্দির ।   এখানেই  নাকি  হনুমান  রামকে  লঙ্কার  অশোকবনে  সীতাকে  খুঁজে  পাবার  সুখবর  দিয়েছিলেন ।  নিজের  অভিজ্ঞান স্বরূপ  যে  মণি  সীতা  রামকে  দেবার  জন্য হনুমানকে  দিয়েছিলেন  সেটি  হনুমান  এখানেই  রামের  হাতে  তুলে  দেন ।    ছাড়াও  রয়েছে    জটাতীর্থম। শিবের  পূজো  করার  আগে  রাম  এই  পুকুরে  স্নান  করে  জটা  ধুয়ে     শুদ্ধ  হয়েছিলেন ।    আজও  এখানে  বহু  পুণ্যার্থী  ডুব  দিতে  আসে। 

এই  পথেই  পড়ে  পঞ্চমুখী  হনুমানের  মন্দির ।  ভাসমান  যে  শিলা   দিয়ে  এখান  থেকে  লঙ্কা  যাবার  সেতু  তৈরি  হয়েছিল  তার  একটি  এই  মন্দিরে  রাখা  আছে ।  আর  হনুমান  এখানে  পঞ্চমুখী  কেন  তারও   কাহিনী  রয়েছে    রাম  আর  রাবণের  যুদ্ধের  সময়  যখন  রাবণের  একটি  বিশেষ  বাণে  রাম  আর  লক্ষ্মণ  অজ্ঞান  হয়ে  যান  তখন  রাবণের  দলের  অহিরাবণ  তাঁদের  দুজনকে  পাতালে  নিয়ে  গিয়ে  লুকিয়ে  রাখেন ।  হনুমান  তখন  তাঁদের  খুঁজতে   খুঁজতে   পাতালে  পৌছে  জানতে  পারেন  যে  যদি  পাঁচ  দিকে  রাখা  পাঁচটি  প্রদীপ একই  সঙ্গে  নিভিয়ে  ফেলা  যায়  তবেই  অহিরাবণকে  মেরে  ফেলা  সম্ভব  হবে ।  আর  রাম  আর  লক্ষ্মণ  জ্ঞানও  ফিরে  পাবেন    তখন  হনুমান  পাঁচটি  মুখের  অধিকারী  হলেন -  একই  সঙ্গে হনুমান,   হায়াগ্রীব,  নৃসিংহ ,  গরুড়  আর  বরাহস্বামীর রূপ  নিয়ে  তিনি  একই  সঙ্গে একটি  ফুঁ  দিয়ে  সেই  পাঁচটি  প্রদীপ  নিভিয়ে  দিলেন ।  অহিরাবণের  মৃত্যু  হল  আর  সঙ্গে  সঙ্গে  রাম  আর  লক্ষ্মণও জ্ঞান  ফিরে  পেলেন ।  হনুমান  সেই  থেকেই  পঞ্চমুখী  রূপেও   পূজিত  হন ।

এবার  আমরা  রওনা   হলাম  ধনুষ্কোডির  পথে।  রামেশ্বরম  দ্বীপের  গঠন  একটি  শংখের  মতন।  তার  পূর্ব  প্রান্তে  ধনুষ্কোডি।  ধনুষ্কোডির  আকার  একটি  তীরের  মত  -  ১৮  কিমি  লম্বা  আর  মাত্র    কিমি  চওড়া  -  যা  গিয়ে  মিশেছে   দুটি  সাগরসঙ্গমে। এটির  একদিকে   শান্ত  বঙ্গোপসাগর,  যার  স্থানীয়  নাম  মহাদধি ,  আর  অপর  দিকে   উত্তাল  ভারত  মহসাগর ,  যার  স্থানীয়  নাম  রত্নাকরণ। লোকে  বলে   ঠিক  এখানেই   নাকি  রাম  তাঁর  ধনুক  ঠেকিয়ে  সেতুনির্মাণের  জায়গাটি   চিহ্ণিত  করেছিলেন।   বিভীষণ   লংকার  রাজা  হবার  পর  তিনি  রামকে  এই  সেতু  ভেঙে  ফেলার  জন্য  প্রার্থনা   জানান।  রামের  ধনুকের  একটি  কোনার  স্পর্শে  সেতু  ভেঙে   চূরমার  হয়ে  যায়।  সেই  থেকেই  এই  জায়গার  নাম  হয়  ধনুষ্কোডি, অর্থাৎ  ধনুকের  দ্বারা  চূর্ণ। “কোডি”  শব্দের  মানে  শেষ  বা  চূর্ণ  হয়ে  যাওয়া।    আগে  লোকেরা  এখানেও  তর্পণ  করতে   আসত।  কিন্তু    ১৯৬৪- র  তুমূল  সাইক্লোনে  পুরো  ধনুষ্কোডি  শহর  নিশ্চিহ্ণ  হয়ে  মুছে  যায়।  আজ  তাই   এটি  একটি  মৃত  শহর,   ইংরেজীতে    যাকে  ghost town  বলে।  জেলেদের  কয়েকটি   কুঁড়েঘর  আর  ভাঙা  কয়েকটি  ইমারত   ছাড়া  আর  কিছুই  অবশিষ্ট  নেই ।  নির্জন  সৈকতের  সৌন্দর্য্য   অবশ্য  দেখার  মত।  এখানে  রূপোর  মত  পরিস্কার  আর  ঝকমকে  বালি  যা  আমাদের   দেশে  সত্যিই  দুর্লভ।

  বারে  ঘরে  ফেরার  পালা।  গভীর  নীল  সমুদ্রের  দিকে  চেয়ে  মনে  হল যে  যদিও  রাম  আর  রামায়নের   নানা  স্মৃতিতে  আজও   রামেশ্বরমের  আকাশ  বাতাস  ভরে     আছে ,  উত্তরকাণ্ডের  দুঃখ  বা  বিষাদের   ছাপ  এখানে   কোথাও  পড়ে  নি।  রাম  এখানে  প্রথমবার  বিরহবেদনায়    ব্যথিত  চিত্তে  এলেও  তারপর  এসেছেন   বিজয়ী  বীর  বেশে।  প্রথমে  প্রত্যাখ্যান  করলেও  পরে  অগ্নিস্নাতা সীতাকে  গ্রহণ  করেছেন  সানন্দে।  তাঁর   সঙ্গে   শিবের  পূজো  করেছেন , করেছেন  যুগল  শিবলিঙ্গ  স্থাপনা। তারপরে    বিভীষণকে    স্বরাজ্যে  প্রতিষ্ঠিত  করে   এখান  থেকে    সগর্বে,  সহর্ষে  ফিরে  গেছেন  স্বদেশ  অযোধ্যায়,  সীতা ,  লক্ষ্মণ  আর  হনুমানকে   সঙ্গে  নিয়ে।  সেই  আনন্দের  রেশ  আজও  ভরে   আছে  রামেশ্বরমের  আকাশে    বাতাসে।