মার্চের শুরু।শীতের দাপট কমে এলেও দিল্লী শহরে তার রেশ ভালোমতনই আছে।
শৈলশহরগুলোয় পর্যটকদের মরশুম শুরু হতে তখনও মাসখানেক বাকী। এমনি সময়ে বিশেষ কাজে
নৈনিতাল যাবার দরকার পড়ল ।আমি তখন লিম্কা বুক অফ রেকর্ডস্ এ সহ সম্পাদক। নৈনিতাল
থেকে এক ভদ্রলোক গত কয়েক মাস যাবৎ ডজন দু তিন চিঠি লিখে তাঁর পরিবারের একটি বাতি
বা ল্যাম্পের কথা জানাচ্ছিলেন যা নাকি একেবারে অভিনব। আমাদের সম্পাদক হঠাতই ঠিক
করলেন যে আমাদের কারো সেটি স্বচক্ষে দেখে আসা দরকার। বই প্রেসে যেতে
দেরী নেই। অতএব এক্ষুনি যাওয়া চাই। নৈনিতাল আমার না দেখা। তাই আমিই যাবার অনুমতি
চাইলাম। আমার এক লেখিকাবন্ধুও সঙ্গে যাবেন বললেন।
ওল্ড্ দিল্লী স্টেশন থেকে আমরা দুজনে রাত ১১টার সময়ে কাঠগুদামের
ট্রেন ধরলাম। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। ট্রেনের কামরাও প্রায় খালি। পরদিন যখন কাঠগুদাম
পৌছলাম তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট স্টেশন।কোথাও জনমানবের সাড়া
নেই। এখান থেকেই পাহাড়ী পথ বেয়ে প্রায় ৬৪০০ ফিট উপরে নৈনিতাল যেতে হয় । অন্য সময়ে
এখানে গাড়ীর ভীড় লেগে থাকে। কিন্তু জনমানব বিরল এই অসময়ে অনেক কষ্টে একটিমাত্র
জীপের সন্ধান পাওয়া গেল। তাইতে করে আমরা পাড়ি দিলাম অজানা পথে। রাস্তার একদিকে গভীর খাদ।
অন্যদিকে জঙ্গল। গাছে গাছে ঘন সবুজের বিস্তার। নতুন পাতার সজীব ছোঁয়া তখনও লাগেনি
তার গায়ে। পাহাড়ের উপরে ওঠার পর বিশাল নীল দিগন্তবিস্তৃত লেকের প্রথম দর্শণ
রীতিমত চমকপ্রদ।
নৈনিতালে হোটেলের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু বেশির ভাগই তখন খালি। তাই আমার স্বামীর
অফিসের গেস্টহাউসে থাকাই আমরা স্থির করেছিলাম। জীপের শব্দ পেয়ে কেয়ারটেকার চোখ
মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। এসেই খবর পেলাম যে হবু রেকর্ডকারী মেসেজ রেখে গেছেন যে
আমরা যেন সূর্যাস্তর পরেই তাঁর বাড়ি যাই কারণ দিনের আলোয় বাতির বিশেষত্ব বোঝা যাবে
না। ভালই হল। তাড়াতাড়ি স্নান আর ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম নৈনিতাল
শহর দেখতে।
গেস্টহাউস থেকে লেক মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। চারদিক স্তব্ধ
নির্জন। লেকের জলের গভীর নীলিমা আকাশের নীলের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। জলের বুকে একটিমাত্র নৌকো।
তাতে মাঝি ছাড়া একজনই যাত্রী। হয়তো আমাদেরই মত হঠাৎ এসে পড়া কেউ। লেকের
পাড় ঘেঁষে অজস্র উইপিংউইলো গাছ, তার পাতায় ভরা ডালগুলো জল ছুঁয়ে আছে।লেক পরিবেষ্টন
করে রয়েছে দুটি পথ। একটি সরু পথ জলের একদম কাছাকাছি। অন্য রাস্তাটি কিছুটা উপরে।
সেটি অনেক বেশী চওড়া আর সুন্দর। পরে জানলাম যে বৃটিশ আমলে এই পথটি ছিল শুধুই গোরাদের জন্য।
স্থানীয় লোকেদের এই পথে চলার অনুমতি ছিল না।
লেকের অন্যদিকে নয়নাদেবীর মন্দির। সেখান থেকে ঘন্টার
শব্দ ভেসে আসছিল। নৈনিতাল পীঠস্থানের মধ্যে অন্যতম। দক্ষযজ্ঞের পর শিবের তান্ডবনৃত্যের
ফলে সতীর দেহের বিভিন্ন অংশ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাঁর চোখ দুটি এসে পড়েছিল এইখানে।
সেই নয়ন থেকেই “তাল” বা সরোবরের সৃষ্টি, তাই এখানকার নাম হয় নৈনিতাল। দেবীর স্থানীয়
নাম তাই নয়নাদেবী বা নৈনিদেবী।
তবে পীঠস্থান হলেও নৈনিতাল শৈলাবাস হয়ে ওঠার আগে
খুব কম লোকই এখানে আসত। তার প্রধান
কারণ পাহাড়ী রাস্তার দু্র্গমতা। কুমায়ুঁ পর্ব্বতমালার বুকে লুকিয়ে থাকা এই লেকের কথা
খুব কম লোকই জানতো।
অজ্ঞাত নৈনিতালের শৈলশহর হয়ে ওঠার কাহিনী রীতিমত
নাটকীয়।
সেটা উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক। ভারত তখন বৃটিশ
সাম্রাজ্যের অন্যতম কলোনী। ইংরেজরা অনেকেই সপরিবারে ভারতে এসে পড়লেও এখানকার গরম আবহাওয়ায়
অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। তাই তারা তখন গড়ে তুলছে একটির পর একটি শৈলাবাস- প্রথমে সিমলা, তার পরে মুসৌরী। ১৮৩৯ সালে ব্যারন নামে জনৈক ইংরেজ ব্যবসায়ী আলমোড়া পাহাড়ে বেড়াতে এসে হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেললেন। অজানা, অচেনা পথে ঘুরতে ঘুরতে আচমকা এসে পড়লেন পাহাড়ের কোলে বিশাল লেকের প্রান্তে। তার চারিধারে ওক, সাইপ্রাস আর উইপিংউইলোর বন,
তারা গিয়ে মিশেছে সুদূর পাহাড়ের গায়ে। কি সুন্দর
শান্ত পরিবেশ! ব্যারনসাহেব তক্ষুনি মনস্থির করে ফেললেন যে চিনির ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে এখানে ইংরেজদের জন্য নতুন একটি শৈলশহর তৈরী করবেন। চারদিক ভালো করে ঘুরে দেখে
বুঝলেন যে এখানে রেসকোর্স আর ক্রিকেট খেলার মাঠও তৈরী করা চলবে। আর নৌকাবিহারের কথা
তো বলাই বাহুল্য। ব্যারন রীতিমতো অবাক হলেন এমন একটি লেকের মাঝে একটিও নৌকো না দেখে।
ফিরে গিয়ে
ব্যারন একেবারে আঁট ঘাট বেঁধে কাজে নামলেন। প্রথমেই নতুন জায়গার চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়ে
ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করলেন। তারপরে নৈনিতালে এসে ঘাঁটি গাড়লেন।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলেন যে লেকের চারদিকের সবচেয়ে সুন্দর আর লোভনীয়
জমির মালিক হলেন নরসিং। সঙ্গে সঙ্গেই ব্যারন ভাব জমালেন তার সঙ্গে। ব্যারনের একটি নৌকো ছিল। তিনি এক দিন নরসিংকে নৌকো চড়ার আমন্ত্রণ জানালেন।
নরসিং যে সাঁতার জানেননা সেটা ব্যারন
কথায় কথায় আগেই জেনে নিয়েছিলেন।
নরসিং বন্ধুর আমন্ত্রন উপেক্ষা করতে পারলেন না। এবারে ব্যারন তাকে লেকের মাঝখানে নিয়ে
গিয়ে বললেন যে ভালো চাও তো এক্ষুনি তোমার সব জমি কম্পানীবাহাদুরের নামে লিখে দাও নয়তো
এই লেকেই হবে তোমার সলিল সমাধি। এই বলে ব্যারন তার পকেট থেকে নোটবই আর কলম বার করে
দিলেন। সেই নোটবুকে নরসিং জমির সব অধিকার ব্যারনকে হস্তান্তরিত করলেন নিতান্তই প্রাণের
দায়ে।
লেকের ধারে সুন্দর সেই জমিতে ব্যারন সর্বপ্রথম নিজের
বাড়ি তৈরী করে তার নাম দিলেন পিলগ্রিম্ কটেজ। সে বাড়ি আজও আছে কিন্তু তার চারপাশে এত
নতুন বাড়ি উঠেছে যে না জানলে খুঁজে পাওয়া মুশ্কিল। তারপরে জোর কদমে বাড়ী তৈরী চলল। ১৮৪৫এর মধ্যেগড়ে উঠল আরো অনেক
কটেজ আর ভিলা। তৈরী হল নতুন মিউনিসিপ্যালিটি। এল আর্মি ক্যান্টনমেন্ট। তৈরী হল গির্জা,
হাসপাতাল, ক্লাবহাউস্ আর বোট ক্লাব। ছুটি কাটাবার ছোট শৈলাবাস পাকাপাকি ভাবে শহরে পরিণত হল।শুধু তাই
নয় নৈনিতাল হয়ে উঠল সবচেয়ে জনপ্রিয় ছুটি কাটাবার আস্তানা। তবে বাড়ী করার জন্য ইংরেজরা বেছে নিল পাহাড়ের ঢাল আর স্থানীয়
সবাইকে ঠেলে দিল লেকের পাড় ঘেঁষা জলা জমিতে। নৈনিতাল লেক ছাড়াও
তখন চারপাশে ছোট বড় অজস্র লেক
ছিল যার সংখ্যা ছিল ৬৬রও বেশী। তাই ইংরজরা তখন নৈনিতালের নতুন নামকরণ করেছিল "লেক ডিস্ট্রিক্ট অফ কুমায়ুঁ"।
সেই লেকগুলির বেশীর ভাগই আজ লুপ্ত, মাত্র কয়েকটি ছাড়া।
আমরা ঠিক করলাম প্রথমেই জিম কর্বেটের বাড়ি গার্নি
হাউস্ দেখতে যাব। নৈনিতালের কথা ভাবতে গেলে সব চেয়ে আগে তাঁ র কথা ও তাঁর "ম্যান
ইটার্স অফ কুমায়ুঁ" র কথাই মনে আসে। জিম কর্বেটের জন্ম হয় ১৮৭৫ সালে এই নৈনিতাল
শহরে। তাঁর বাবা ছিলেন এখানকার পোস্টমাস্টার। কর্বেটের ছোটবেলা কাটে নৈনিতালের পাহাড়
আর জঙ্গলে। তখনই এখানকার লোকেদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে যা
তাঁর স্বজাতিবর্গের শত বাধা নিষেধ সত্বেও অব্যহত ছিল। তিনি নিজে সামান্য রেল কর্মচারী
ছিলেন। কিন্তু নিজের স্বল্প বেতন থেকেই তিনি গরীব গ্রামবাসীদের যথাসাধ্য সাহায্য করতেন।
সে কথা এখানকার লোকেরা আজও ভোলেনি। গার্নি হাউস্ তাই নৈনিতালের দ্রষ্টব্যের মধ্যে অন্যতম।
গার্নি হাউস আয়ারপাট্টা পাহাড়ের উপরে। ওক, ফার,
দেওদার আর পাইন বনের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা বেয়ে উঠতে হয়। আর আছে রডোডেন্ড্রণ গাছ, কিছু ফুলও ফুটে আছে। মনে পড়ে গেল শেষের কবিতার "উদ্ধত
যত শাখার শিখরে রডোডেন্ড্রণগুচ্ছ"। গার্নি জিম কর্বেটের বাবার নাম ছিল।। সেই বাড়ি
এখন মিউজিয়াম। কর্বেটের ব্যবহৃত জিনিষপত্র সেখানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
এই পাহাড়েরই অন্য দিকে ডরোথীস্ সীট। কোলেট নামের জনৈক ইংরেজ পাহাড়র চূড়ায় এই বেদীটি তাঁর মৃতা স্ত্রী
ডরোথী্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তৈরী করেন। ডরোথীর মৃত্যু হয়েছিল এক বিমান দুর্ঘটনায়। এখান
থেকে নৈনিতালের দৃশ্য অবর্ণনীয়। লোকে এটাকে টিফিন টপ বা ল্যান্ড্স্ এন্ডও বলে। আর দেখার
আছে বোটানিকাল গার্ডেন আর সেন্ট জনস্ চার্চ যা এই শহরের
প্রাচীনতম ইমারতের অন্যতম।
পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে চলার পথে চোখে পড়ে খানিকটা বাঁধানো
সমতল জমি যা এখানে "ফ্ল্যাটস্" নামে পরিচিত। ইংরেজদের শাসনকালে এটি প্যারেডের
জন্য ব্যবহার হত। তা ছাড়া প্রতি রবিবার সকাল সন্ধ্যায় লোকে এখানে আসতো মিলিটারী ব্যান্ডের
বাজনা শোনার জন্য। পরবর্তীকালে বহু হিন্দী ফিল্মের শুটিং এখানে হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৬০র
দশকে। এখন এটা প্রধানতঃ খেলার জন্য ব্যবহার হয়।
লেকের ধারেই রয়েছে ইংরেজদের স্থাপনা করা বোট ক্লাব।
এখনও এখানে প্রতি জুন মাসে Kingfisher Yachting Compitition হয়, যা দেখতে পর্যটকদের
বিশেষ ভীড় হয়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল যে বৃটিশ আমলে এই ক্লাবে ইংরেজ ছাড়া আর কারো
ঢোকার অনুমতি ছিল না কিন্তু ইরেজ হওয়া সত্বেও সামান্য পোস্টমাস্টারের ছেলে বলে এখানে
জিম কর্বেটের প্রবেশাধিকার ঘটে নি । বংশকৌলীন্য এমনই জিনিষ!
নয়না পীক্ বা চীনা পীক্ নৈনিতালের সর্বোচ্চ শিখর,
যার উচ্চতা ৮,৫৬৮ ফিট। এখান থেকেও যেমন সুন্দর হিমালয়ের দৃশ্য, তেমনি অনুপম নীচের শহরের
দৃশ্য। দূরে চোখে পড়ে হনুমানগড়্হী। সেখান থেকে সূর্যাস্তের শোভা নাকি অসাধারণ। সময়াভাবে
আমাদের আর সেখানে যাওয়া হল না। এবারে হবু রেকর্ডকারীর বাড়ি গিয়ে তার বংশের প্রাচীন
আলো দেখার পালা।
কাজ শেষ করে পরিশ্রান্ত অবস্থায় গেস্টহাউসে ফিরেই
শুনলাম যে আমার বন্ধুকে তখনই তার আত্মীয়ের বাড়ি চলে যেতে হবে, কাল সকালের আগে তার ফেরা হবে না। যাক, কি আর করা।
সকাল সকাল শুয়ে পড়লেই হবে। কিন্তু সেটা আর হল না। কারণ শুনলাম যে আমার স্বামীর অফিসের
দুজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। নানা কথার পর চলে যাবার সময় তাঁদের মধ্যে
একজন আমায়
বললেন, "ম্যাডাম, আপ বহুত হিম্মতওয়ালী
হ্যাঁয়"
"কেন বলুন তো?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
" এই নির্জন এলাকায় একদম একা থাকছেন তো......."
"একা হবে কেন, কেয়ারটেকার তো আছে"
"সে তো বিকেল পাঁচটার মধ্যেই কাজ সেরে নিজের গ্রামে ফিরে যায়"
মনে পড়ল যে কেয়ারটেকার বলেছিল বটে যে পাঁচটার মধ্যে রাত্রের খাবার করে
হটকেসে রেখে দেবে। কিন্তু চলে যাবার কথা কিছু
বলেনি তো!
বললাম, "একটু ওপরেই তো পোস্টঅফিস। পোস্টমাস্টার তো আছেন সেখানে।"
"তিনি তো আজ বিকেলেই সপরিবারে দিল্লী গেলেন।"
একটু থতমত খেয়ে বললাম, "পোস্টঅফিসে রাত্রে দারোয়ান থাকে না?"
"তা থাকে। তবে কিনা......হেঁহেঁ........সন্ধ্যার পর থেকে তো সে......হেঁহেঁ........মানে,
আপনি ঠিকমতো দরজা টরজা বন্ধ করে নেবেন আমরা চলে গেলেই।"
যাঃ বাবা!
বাইরে ঘন অন্ধকার। লেকের ও ধারে পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি আলো
টিম টিম করে জ্বলছে। কোথাও জনমানবের সাড়া নেই। রীতিমত গা ছম ছম করা অনুভূতি!
তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে বিছানায় বসতেই টিভির দিকে চোখ পড়ল। যাক টিভি দেখে খানিকটা সময় কাটানো যাবে। কারণ ঘুম তখন বহু দূর! কেবল্ নেই, শুধুই দূরদর্শন। সেখানে তখন রবিবারের ফিল্ম চলছে। টিভি খুলতেই দেখি
জলার ধারে এক পোড়ো বাড়ি, তার সামনে কঙ্কালের হাত নেড়ে এক ছায়ামূর্তি বলছে, "যুগ
যুগান্ত ধরে আমি তোমারই রক্তের লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছি"। কি সর্বনাশ! টিভিতেও এই!
তাড়াতাড়ি টিভি বন্ধ করে কম্বলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। নিশুতি রাতে বাইরের ধপ ধপ শব্দ
শুনে মনে হচ্ছিল কার যেন পায়ের আওয়াজ। দূরে পাইন বনে হাওয়ার শব্দ যেন কার দীর্ঘশ্বাস!
কোন রকমে জেগে ঘুমিয়ে রাত কেটে গেল।
সকালবেলার ঝলমলে রোদে সবটাই খুব হাস্যকর মনে হল। ততক্ষণে কেয়ারটেকার এসে
ব্রেকফাস্ট তৈরী করে ফেলেছে। স্নান সেরে তৈরী হতে হতে আমার বন্ধুও এসে পড়ল। সারা দিনের
জন্য ট্যাক্সি ঠিক করাই ছিল, বাকী দর্শনীয় জায়গা দেখার পর আমাদের রাত্রের আগেই কাঠগুদাম
পৌছে দেবে ফেরার ট্রেন ধরার জন্য।
অন্যান্য লেক পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ার আগে কিছু সুভেনীর কিনতে হবে। দু একটি
সরকারী দোকান সারা বছরই খোলা থাকে। সেখানে স্থানীয় উলের বোনা সুন্দর শাল, স্কার্ফ আর
সোয়েটার রয়েছে। আর রয়েছে বেশ কিছু হাতের কাজ আর কাঠের জিনিষ । আগেই শুনেছিলাম যে
নৈনিতালর বিশেষত্ব হল মোমবাতি। আমরা সোজা মোমবাতির কারখানায় চলে গেলাম। তার
লাগোয়া শো রুমে কত রকমের, কত রং আর আকারের মোমবাতি। চোখে না দেখলে কল্পনা করা যায় না।
মোমের তৈরী বাড়ি, গির্জা, গাছ, জন্তু, জানোয়ার, পাখি, শিকারী, নর্তকী আরো কত
কি আর কি তার রঙের বাহার! আমরা দুজনে এক ঝুড়ি মোমবাতি কিনে ফেললাম।
এবারে আমরা রওনা দিলাম ভীমতালের পথে। ভীমতাল নৈনিতাল থেকে ২৩ কিমি দূরে এক
বহু প্রাচীন জনপদ। কিংবদন্তী বলে যে পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময়ে ভীম দ্রৌপদীর জন্য এই সরোবর থেকে পদ্মফুল তুলে এনে দিয়েছিলেন তাই ভীমের নাম জড়িয়ে আছে এই সরোবরের সঙ্গে। এটিও
নৈনিতাল লেকের মতই বিশাল। তার মাঝখানে একটি দ্বীপ।
নৌকো করে যেতে হয়। এখানকার লেক রিসর্টটি বিশেষ জনপ্রিয়। কয়েকটি রেস্তোরাঁও রয়েছে খোলা
আকাশের নীচে। আমরা তার একটিতে চা খেতে বসে গেলাম, সঙ্গে গরম পকৌড়া। ভীমতালে একটি ছোট ফোক্ কালচার মিউজিয়াম আছে। সেখানে
পুরোনো দিনের নানা অস্ত্রশস্ত্র
, মূর্তি, গয়না, ও আরো নানা রকমের জিনিস রাখা আছে।
ভীমতাল থেকে ১৩ কিমি দূরে আর একটি সুন্দর লেক যার
নাম হল নৌকুচিয়াতাল যার মানে হল ন'টি কোনা ওয়ালা তাল বা সরোবর। লোকে বলে যে লেকের নীচে
একটি নির্ঝর বা spring রয়েছে যার থেকে এই লেকের সৃষ্টি। অনেকের মতে এটিই উত্তরাঞ্চলের সব
চেয়ে মনোরম সরোবর। তার প্রধান কারণ, এখানকার পরিবেশ এখনও শান্ত, স্তব্ধ ও নির্জন। ওক আর পাইন ঘেরা এই লেক শহরের কোলাহল থেকে অনেক
দূরে। এক দিকের পদ্মবনে ভ্রমরের মেলা তপোবনের কথা মনে
করিয়ে দেয়। নৌকুচিয়াতাল সম্পর্কে একটি মজার জনশ্রুতি আছে। যদি কেউ একই সঙ্গে এই লেকের
ন টি কোনা দেখতে পান তাহলে তাঁর সর্ব মনোকামনা পূর্ণ হবে। বলাই বাহুল্য আমরা অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই লেকের ন টি কোনা একসঙ্গে
দেখতে পেলাম না। সেটা বোধহয় এক হেলিকপ্টারে ছাড়া দেখা সম্ভবও নয়।
এবারে সাততাল, তার পরেই ফিরে যাবার পালা। সাততাল হল ভীমতাল থেকে ১৩ কিমি দূরে, প্রায় ৪,০০০ ফিট
উঁচুতে ওক আর পাইন বনের মাঝে সাতটি লেকের সমষ্টি।
ভীমতালের মতই সাততালের কাহিনী রামায়ন আর মহাভারতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বনবাসের সময় শুধু
যে রাম আর সীতা এখানে পদার্পণ করেছিলেন তাই
নয়, রাজা নলের ছোট ভাই পুষ্কর যখন নলকে রিক্ত ও নিঃস্ব অবস্থায় তাড়িয়ে দেয় তাঁর রাজ্য থেকে, তখন নল আর দময়ন্তীর জীবনের বেশ
কিছু বছর কেটেছিল এই সাততালে। অন্ততঃ কিংবদন্তী তাই বলে। সাততালের নামও তাই তাদের নামে
- রামতাল, লক্ষ্মণতাল, সীতাতাল, নলতাল, দময়ন্তীতাল, গরুড়তাল আর শুখাতাল।
লেকগুলো সবই পরস্পরের সঙ্গে জোড়া। বর্ষার
পরে সব গুলোই জলে টলমল করে। শহর
থেকে অনেকটাই দূরে বলে ভীড়ের ছোঁওয়া এদের সৌন্দর্য্য নষ্ট করতে পারেনি। সাধারণ পর্যটকরা
এত দূরে আসে না। যারা আসে তারা প্রকৃতির অনাবিল শান্তি উপভোগ করতে অথবা প্রাণী আর উদ্ভিদজীবনের (পাখি, প্রজাপতি,
মাছ , গাছপালা ইত্যাদির) পর্যাবেক্ষণ করতে আসে। শুনলাম এখানে নাকি প্রায়
৫০০ রকমের পাখী ( তার মধ্যে অনেক গুলো
বিশেষ ঋতুতে আসে ) ২০ রকমের জন্তু জানোয়ার, ৫২৫ রকমের প্রজাপতি, ১১,০০০ ও বেশী কীটপতঙ্গ আর বহু রকমের মাছ দেখতে
পাওয়া যায়। এখানে ক্যাম্পিং এর ব্যবস্থাও আছে। আর দ্রষ্টব্যের মধ্যে আছে বাটারফ্লাই
মিউজিয়াম যা সত্যিই দর্শনীয়। ফ্রেডরিক স্মেটাচেকের স্থাপনা করা এই মিউজিয়ামে ২৫,০০০
রকমের প্রজাপতি আর মথ রাখা আছে, আরো আছে ১১০০ রকমের কীটপতঙ্গ, যার সবই এই এলাকায় সংগ্রহকরা।
ফ্রেডরিক এখানে "দি বাটারফ্লাই ম্যান" নামেই পরিচিত।
শুনলাম ওক বনের গভীরে সুভাষধারা নামে একটি ঝর্ণা আছে। সমায়াভাবে আমাদের আর সেখানে যাওয়া হল না। সন্ধ্যার ছায়া
নেমে আসছে। অন্ধকারে পাহাড়ী পথে গাড়ি চালানো নিরাপদ নয়। ইচ্ছা না করলেও এই নান্দনিক
পরিবেশকে এবার বিদায় জানাতে হল। নীল আর সবুজের নয়নাভিরাম স্মৃতি
মনের মধ্যে রেখে আমরা রওনা হলাম ফেরার পথে।
স্বপ্না দত্ত
No comments:
Post a Comment