অক্টোবর শেষ
হতে সপ্তাহখানেক বাকী।
আকাশে বাতাসে লেগে
আছে পূজোর রেশ। ভোরের
আলো ফোটার আগেই
আমরা পণ্ডিচেরী থেকে
রওনা হলাম রামেশ্বরমের
পথে। সেতুপতি সাম্রাজ্যের
অন্তর্গত এই ছোট্ট
দ্বীপটির এক দিকে
বঙ্গোপসাগর আর অপর
দিকে ভারত মহাসাগর।
পূবে পুরী, পশ্চিমে
দ্বারকা উত্তরে বদরীনাথ
আর দক্ষিনে রামেশ্বরমকে
“চারধাম” বলেন অনেকেই।
এই চার ধামের
মধ্যে একমাত্র রামেশ্বরমের আরাধ্য দেবতা
হলেন শিব। অন্য
তিনটির অধীশ্বর বিষ্ণু।
কিন্তু রাম নিজে
বিষ্ণুর অবতার হওয়া
সত্ত্বেও শিবের পূজা
করেছিলেন এই রামেশ্বরমে।
তাই এটি শৈব
আর বৈষ্ণব দুজনেরই
পূণ্যভূমি।
পণ্ডিচেরী থেকে
বেরিয়ে ভিল্লুপুরম পেরোতেই
পুরো এক ঘন্টা
লেগে গেল। কিন্তু
শহর পেরোলেই চমৎকার
ন্যাশনাল হাইওয়ে। গাড়ী প্রায় হাওয়ার
গতিতে উড়ে চলল।
চেয়ে দেখলাম স্পিডের
কাঁটা ১০০ আর
১১০র মধ্যে স্থির
হয়ে আছে। পথেই
ত্রিচীর শ্রীরঙ্গম আর
মাদুরাইর মীনাক্ষীদেবীর মন্দির
দেখার লোভ সম্বরণ
করে এগিয়ে চললাম
কারণ সন্ধ্যার আগেই
রামেশ্বরম পৌঁছতে হবে। এবারে একটি
বিশেষ কারণে সেখানে
চলেছি যার জন্য
কিছু ব্যবস্থার প্রয়োজন।
আমার স্বর্গতা মায়ের
বিশেষ ইচ্ছা ছিল
রামেশ্বরম দর্শণ করবার।
তাঁর অন্তিম সংস্কারও
যেন গয়ার পরিবর্তে
সেখানে করা হয়
সে কথাও তিনি
জানিয়েছিলেন। নানা কারণে
মায়ের রামেশ্বরম দর্শণ
সম্ভব হয় নি।
তাঁর সেই অপূর্ণ
সাধ পূর্ণ করার
জন্য আজ আমাদের
রামেশ্বরম যাত্রা।
রামেশ্বরম থেকে
৭০ কিমি দূরে সমুদ্রের তীরে অবস্থিত
দেবীপটনম নামে ছোট
একটি গ্রাম। কথিত
আছে এখানেই দেবী
দূর্গা মহিষাসুরকে বধ
করেছিলেন । আজ
তার সাক্ষ্য দিচ্ছে
একটি বিরাট পুকুর
যার পাশে রয়েছে
দেবী দূ্র্গার ছোট
একটি মন্দির। স্থানীয়
লোকেরা তাঁকে উলাকানায়কীআম্মা নামে
পূজা করে। কাছেই
নবপাষাণম । রামেশ্বরমে যাবার
আগে লোকে এখানে
আসে পূর্বপুরুষদের তর্পণ
করতে। শোনা যায়
সীতাহরণের পর রাম
প্রথমে এখানেই পদার্পণ
করেছিলেন সেতু কোথায়
বাঁধা হবে স্থির করার
জন্য। উত্তাল সমুদ্র
আর শিলাময় সমুদ্রতট
দেখে তিনি প্রথমে
নবগ্রহের উপাসনা করেন।
সাগরবেলা থেকে ন’টি
শিলা কুড়িয়ে এনে
রাম সমুদ্রতটেরই এক
প্রান্তে নবগ্রহের স্থাপনা করেন।
নবগ্রহ অর্চনার পর
তিনি পূর্বপুরুষদের তর্পণ
করে সমুদ্রকে শান্ত
হবার জন্য প্রার্থনা
জানান। এখানে সমুদ্র
আজও দীঘির মতই
শান্ত। শুনলাম সমুদ্রর
ও পারেই শ্রীলংকা।
রামের স্থাপনা করা
এই নবগ্রহ বা
নবপাষাণে লোকে এখনও
তর্পণ করতে আসে।
নব
পাষাণের তিন দিকে
নীচু দেওয়াল তোলা।
চতুর্থ দিকে খোলা
সমুদ্র। নব পাষাণ
তাই সব সময়ই
জলে নিমজ্জিত থাকে।
তবে বছরের অন্য
সময় শুধু হাঁটুজল
থাকে তাই তর্পণের
সময় নবগ্রহদের স্পর্শ
করা যায়। কিন্তু
তখন সময়টা বর্ষার
ঠিক পরেই বলে
দেখা গেল ন’টির
মধ্যে চারটি শিলাই
জলের নীচে, পাঁচটি
মাত্র দেখা যাচ্ছে।
এখান থেকে
খুব কাছে হাজার
বছরেরও বেশী পুরোনো
জগন্নাথের মন্দির। লোকে
বলে এই মন্দিরে
নাকি পুত্রহীন রাজা
দশরথ এসেছিলেন তনয়লাভের
জন্য প্রার্থনা জানাতে,
পুত্রেষ্ঠী যজ্ঞ করাবার
আগে। এখনও এখানে
বহু সন্তানহীন দম্পতি
পূজো দিতে আসেন।
নব পাষাণে তর্পণ
করতে চাইলে এই
মন্দিরের পূজারী তার
ব্যবস্থা করে দেন। নব পাষাণের
কাছে গিয়ে দেখলাম
যে ইচ্ছা থাকলেও
কাছে গিয়ে তর্পণ
করা যাবে না
কারণ সেখানে আমাদের
বুকজল। আমরা হাঁটুজলে
নেমে দাঁড়ালাম। পুরোহিত
কাছে গিয়ে নবগ্রহ
স্পর্শ করে আমাদের
মন্ত্রপাঠ করালেন।
এবার পাড়ি
দিলাম রামেশ্বরমের পথে।
পেম্বান স্ট্রেটের উপর দিয়ে
লম্বা ব্রীজ পেরিয়ে
রামেশ্বরম দ্বীপে যেতে
হয়। সমুদ্রের উপরে
সেতু পেরোনো রীতিমত
গা-ছম ছম-করা অনুভূতি। পাশেই
অনেকটা নীচে ১০০ বছরেরও
বেশী পুরোনো রেলওয়ে
ব্রীজ। তার উপর
দিয়ে ছোট রেলগাড়ী
গুটিগুটি চলেছে। সূর্যাস্ত
হয় হয়। শান্ত
নীল সমুদ্রের জলে
লেগেছে গাঢ় লালের
ছোঁওয়া। তারি মাঝে
অজস্র মাছ-ধরা নৌকো
নোঙর ফেলে স্থির
হয়ে দাঁড়িয়ে।
এবার আমরা
রামেশ্বরমে ঢুকলাম। এই
রামেশ্বরম রামায়নের চেয়েও
প্রাচীন। তাই চারিদিকে
রাম, সীতা, হনুমান
আর রামায়নের নানা
চরিত্রের অনেক সুখদুঃখের
কাহিনী ছড়িয়ে আছে
যা আজও লোকের
মুখে মুখে ফেরে।
প্রথমেই মনে
প্রশ্ন জাগে, এই
তীর্থর নাম অগ্নিতীর্থ
কেন। শুনলাম রাবণবধ
আর লংকা বিজয়ের
পর রাম লক্ষ্মণ
ও সীতাসহ ফিরে
এসেছিলেন এই রামেশ্বরমে।
রাম তখন সীতাকে
বলেন যে স্বামী
হিসেবে, রাজা হিসেবে
এবং ক্ষত্রিয় হিসেবে
রাবণের হাত থেকে
তোমাকে উদ্ধার করা
আমার কর্তব্য ছিল,
তা আমি পালন
করেছি। কিন্তু তোমাকে
স্ত্রী বলে গ্রহণ
করা আর আমার
পক্ষে সম্ভব নয়।
অভিমানিনী সীতার মনে
হল যে এ
কথা শোনার পর
তাঁর বেঁচে থাকটাই
অর্থহীন। তিনি লক্ষ্মণকে সমুদ্রতটে
তাঁর জন্য চিতা
সাজাতে বললেন। সেই
জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ
দেওয়া সত্ত্বেও কিন্তু
আগুণ তাঁকে স্পর্শ
করল না। স্বয়ং
অগ্নিদেব আবির্ভূত হয়ে
সীতাকে রামের কাছে
ফিরিয়ে দিয়ে বললেন
যে সীতার পবিত্রতা
সম্পর্কে সন্দেহ করার
কোন কারণ নেই।
এতদিন ধরে রাবণের
গৃহে বন্দী থাকার
দরুণ যদি কোন
অপরাধ তাঁকে স্পর্শ
করেও থাকে , সেই
অনিচ্ছাকৃত অবস্থানের অপরাধ টুকুও
অগ্নিদেবের আশীর্বাদে নিশ্চিহ্ন
হয়ে গেছে। রাম
তখন সানন্দে সীতাকে
গ্রহণ করলেন। সেই
থেকেই এই সমুদ্রতট
পূণ্যভূমি অগ্নিতীর্থ নামে
পরিচিত হল।
কিন্তু এখানেই
কাহিনীর শেষ নয়।
এই ঘটনার একটু
পরেই সেখানে এসে
উপস্থিত হলেন অগস্ত্য
মুনি। তিনি রামকে
বললেন যে লংকা
বিজয়ী হলেও রাবণ কে
বধ করার দরুণ
রাম ব্রহ্মহত্যার পাপে
পাপী। রাবণের আচরণ
যতই নিন্দনীয় হোক
তিনি ঋষিপুত্র ছিলেন। অগস্ত্য
আরো বললেন যে
এই পাপ থেকে
মুক্তি পেতে হলে
তাঁকে শিবের পূজো
করতে হবে। কিন্তু
এই ছোট্ট নির্জন
দ্বীপে শিবলিঙ্গ কোথায়?
রাম হনুমানকে কৈলাশে
পাঠা লেন শিবলিঙ্গ নিয়ে
আসার জন্য। কিন্তু
হনুমানের আর ফেরার
নাম নেই। এদিকে
সময় বয়ে যায়।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে
পূজো সম্পন্ন হওয়া
চাই। তখন সীতা
সমুদ্রের বালি দিয়ে
শিবলিঙ্গ গড়ে দিলেন।
রাম সমুদ্রে স্নান
করে পূজোয় বসলেন।
পূজো সবে শেষ
হয়েছে এমন সময়
হনুমান কৈলাশ থেকে
শিবলিঙ্গ নিয়ে ফিরে
এলেন।
রামের পূজো
শেষ হয়ে গেছে
দেখে হনুমানের খুব
অভিমান হল। সীতা
তখন হনুমানকে সান্ত্বনা
দিয়ে বললেন, আমার
গড়া এই শিবলিঙ্গ
তো বালির তৈরী।
এখনই ভেঙে যাবে।
হনুমান সগর্বে বললেন,
আমার ল্যাজের একটি
ঝাপটাতেই ওটি চূরমার হয়ে
যাবে। কিন্তু এক
ঝটকা তো দূরের
কথা আপ্রাণ চেষ্টা
করেও হনুমান বালির
সেই শিবলিঙ্গ এক
চুল নড়াতে পর্যন্ত
পারলেন না। নিজের
ভুল বুঝতে পেরে
হনুমান তখন সীতার
পায়ে ধরে ক্ষমা
চাইলেন। আর রাম
বললেন যে দুটি
শিবলিঙ্গই এখানে পাশাপাশি
থাকবে। আমি পূজো
করেছি বলে প্রথমটির
নাম হবে রামালিঙ্গম।
আর কৈলাশ থেকে
আনা তোমারটির নাম
হবে বিশ্বলিঙ্গম । তবে
আমার আদেশে সব
সময় আগে পূজো
হবে বিশ্বলিঙ্গমের।
রামেশ্বরমের মন্দির
এই যুগল শিব লিঙ্গের উপর
প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরকে সবাই
রামনাথস্বামীর মন্দির বলে।
বহু শতাব্দী ধরে
রামেশ্বরম সেতুপতি সাম্রাজ্যের
অন্তর্গত। ৭ একড়
জমির উপর অবস্থিত
বিশাল এই মন্দির
তাদেরই তৈরী। এত
বড় মন্দির ভালোভাবে
দেখতে অনেক সময়
লাগবে বলে আমরা
প্রথমে বিবেকানন্দ মণ্ডপম
দেখতে চলে গেলাম।
এই মন্দির পরে
সময় নিয়ে দেখা
যাবে ।
অনেকেরই হয়তো
জানা নেই যে
স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো
যাত্রায় সেতুপতি ভাস্করের
(যিনি রাজা রামনাড
নামেও পরিচত) অনেকখানি
অবদান ছিল। স্বামীজী
স্থির করেছিলেন যে
শিকাগো থেকে দেশে
ফেরার পথে তিনি
এখানেই প্রথম পদার্পণ
করবেন। কলম্বো পর্যন্ত
জাহাজে এসে, সেখান
থেকে স্টিমারে করে
তিনি যখন রামেশ্বরম
পৌছলেন তখন তাঁকে
স্বাগত জানাতে সেতুপতি
ভাস্কর স্বয়ং এসে
দাঁড়ান সমুদ্রের তীরে।
সেখানে হাঁটু গেড়ে
বসে তিনি স্বামীজীর
কাছে প্রার্থনা জানান
যে তিনি যেন
মাটিতে পা রাখার
আগে তাঁর ওপরে
আগে পা রাখেন।
স্বামীজী ভাস্করের এই
অনুরোধ না রাখলেও
তার আতিথ্য সানন্দে
স্বীকার করে তিন
দিন রামেশ্বরমে ছিলেন । সেই
থেকে এই জায়গার
নতুন নাম হল
কুন্দুকাল, অর্থাৎ যেখানে
(সেতুপতি ) নত হয়েছিলেন
। এখানেই তিনি
একটি স্মারক বা
মণ্ডপম স্থাপনা করেন।
এটি সমুদ্র থেকে
মাত্র কয়েক গজ
দূরে, সমুদ্রতটের উপরেই
তৈরী।
রামেশ্বরমে থাকাকালীন
স্বামীজী রামনাথস্বামী মন্দির
প্রাঙ্গনেও ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই
সময়েই তিনি বলেছিলেন:
“...... he
who thinks, "I will get to heaven before others I will get Mukti before
others" is the selfish man. The unselfish man says, "I will be last,
I do not care to go to heaven, I will even go to hell if by doing so I can help
my brothers." This unselfishness is the test of religion. He who has more
of this unselfishness is more spiritual and nearer to Shiva. Whether he is
learned or ignorant, he is nearer to Shiva than anybody else, whether he knows
it or not. And if a man is selfish, even though he has visited all the temples,
seen all the places of pilgrimage, and painted himself like a leopard, he is
still further off from Shiva.”
রামেশ্বরমে স্বামীজীর
পদার্পণের দিন ছিল ২৬
শে জানুয়ারী , ১৮৯৭।
দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা
যখন মণ্ডপমে এসে
পৌঁছলাম তখন সেখানে
লোড শেডিং চলছে।
তবু এমরজেন্সী লাইটের
আলোয় হলের মাঝখানে
স্বামীজীর বিশাল মূর্তি
দেখে ভাল লাগলো।
হলের এক প্রান্তে
ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও
সারদা মায়ের বিরাট
ছবি। বাকী সব
দেওয়ালে রয়েছে স্বামীজীর নানা সময়কার
ছবি। আর রয়েছে
ঠাকুর, শ্রীমা আর
স্বামীজীর বাণী। কিন্তু
সবই তামিলে লেখা,
অন্য কোন ভাষা
নেই। একটু আশ্চর্য লাগে
ঠিকই । তবুও দক্ষিণের
এই সুদূর প্রান্তের
জন সাধারণের কাছে
ঠাকুর, শ্রীমা আর
স্বামীজী এত ভালবাসার
আর কাছের মানুষ
জেনে সত্যিই ভাল
লাগল। শ্রীমাও শশী
মহারাজের সঙ্গে রামেশ্বরমে
এসেছিলেন।
শুনলাম রামকৃষ্ণ
তপোবনম ট্রাস্ট নামের
একটি স্বাধীন সংস্থা
বিবেকানন্দ মণ্ডপমের দেখাশোনা
ও কাজ পরিচালনা
করে। অন্যান্য অনেক
কাজের মধ্যে এরা
গ্রামবাসী, বিশেষ করে জেলেদের
ছেলেমেয়েদের জন্য, অনেকগুলি
স্কুল চালায়। রাত
হয়ে গিয়েছিল। পরদিন
সকালে অনেক কাজ ।
তাই গেস্ট হাউসে
ফিরে এসে তাড়াতাড়ি
খাওয়া দাওয়া সেরে
শুয়ে পড়লাম। এখানে
বহু লোক আসে
সারা বছর ধরে ,
সম্ভবতঃ সেই জন্যই
খাবার জায়গাগুলোতে দক্ষিণী
খাবার ছাড়াও অন্যান্য
খাবার পাওয়া যায়।
পরদিন ভোরবেলায়
পৌঁছে গেলাম রামনাথস্বামীর মন্দিরে।
মন্দিরের এক প্রান্তে
রয়েছেন বিশালাক্ষী দেবী।
তাঁর বেদীর পাশেই
স্ফটিকের তৈরী জ্যোতির্লিঙ্গম। লোকে
বলে লংকার রাজা
হবার পর বিভীষণ
এসে নাকি এঁর
স্থাপনা করেন। এঁর
পূজো আর আরতি
হয় খুব ভোরে,
সূর্যোদয়ের আগেই। সে
এক আশ্চর্য্য অভিজ্ঞতা।
ভোরের আলো আর
মন্দিরের প্রদীপ, ধূপের
গন্ধ আর ফুলের
সৌরভ , তার সঙ্গে
মন্ত্রধ্বনি আর কাঁসর- ঘন্টার
শব্দ মিলে এক
অনবদ্য পরিবেশ রচনা
হয়েছিল । মনে
পড়ে গেল এই
মন্দিরেরই গর্ভগৃহে রয়েছে
স্বয়ং রামের প্রতিষ্ঠিত
ও পূজিত যুগল
শিবলিঙ্গ। এই পরিবেশে
হঠাৎ যেন ত্রেতা
যুগকে খুব কাছের
বলে মনে হল।
এর
পর বর্তমানে ফিরে
আসার পালা। অন্তিম
সংস্কার করার আগে
সর্ব প্রথম অগ্নিতীর্থের
সমুদ্রে ডুব দিতে
হয়। বর্ষার ঠিক
পরেই বলে বীচ
অথবা সমুদ্রতট বলে
কিছু নেই। মন্দিরের
চত্বর থেকে দু
পা এগোলেই রাস্তা। রাস্তার কোল
ঘেঁষে সোজা সমুদ্র।
পা দিলেই হাঁটুজল।
দু পা এগোলেই
কোমরজল। ভাগ্যবশতঃ সমুদ্র
এখানে খুবই শান্ত। কিন্তু
উঁচু ঢেউ না
থাকলেও জলের চাপ
প্রচণ্ড- সোজা হয়ে
দাঁড়ানোই মুশ্কিল। ভোরের
সময় হলেও তখনই
সমুদ্রে বহু লোকের
মেলা। অনেক দূর
পর্যন্ত বুকজল কিন্তু
সাঁতার না কেটে
এগিয়ে যাওয়া সহজ
নয়। এদের মধ্যে
অনেকেই পূণ্যার্থী। আবার
অনেকে এসেছে নিছক
আনন্দ করতে। কয়েক
জনকে জলের মধ্যে
পড়ে যেতেও দেখলাম।
ডুব দিতে আমার
চিরদিনই ভয় কিন্তু
এ ক্ষেত্রে তিনটি
ডুব না দিলেই
নয়। কোনমতে নিয়ম
রক্ষা করে তীরে
উঠে এলাম। সামনেই
শংকর মঠ। তার
প্রাঙ্গনে কাজে র ব্যবস্থা। সেটা অগ্নিতীর্থে
ডুব দেবার পর
ভিজে কাপড়ে করা নিয়ম।
প্রয়োজনীয় সামগ্রী
ও পুরোহিতের ব্যবস্থা
আগে থেকেই করা
ছিল। পুরোহিত আমাদের দুজনকেই
কাজ করতে বললেন
। তার কারণ , এই অগ্নিতীর্থে তর্পণের মাহাত্ম
নাকি আলাদা । সংক্ষিপ্ত
অনুষ্ঠান, কোন বাহুল্য
বা আড়ম্বর নেই।
পুরোহিতের স্পষ্ট সংস্কৃত
উচ্চারণ বুঝতে কোন
অসুবিধা হল না।
সব শেষে আমাদের
দুজনের বাবা - মা, পিতামহ - পিতামহী, , মাতামহ - মাতামহী
ও তাঁদের চারজনের
পিতা ও মাতাকে
স্মরণ করে বলা
হল, “ হে পূর্বপুরুষ
ও মাতৃকা গণ, সীতার
স্পর্শধন্য এই অগ্নিতীর্থে
তোমাদের সবার জন্য
এই তর্পণ করা হল
। তোমরা যে লোকেই
এখন অবস্থিত হয়ে
থাকো , তোমরা সবাই পরিতৃপ্ত
হও” ।
শুনলাম তার
পরেও একটা বিরাট
পর্ব বাকী যা
মন্দিরে ঢোকার আগে
শেষ করতে হবে ।
রামনাথস্বামীর এই বিশাল
মন্দির প্রাঙ্গনে ২২- টি
“তীর্থ” রয়েছে। সাবিত্রী
তীর্থ, গায়ত্রী তীর্থ,
সরস্বতী তীর্থ, মহালক্ষ্মী তীর্থ, সূর্য
তীর্থ চন্দ্র তীর্থ
ইত্যাদি। প্রতিটি তীর্থের
প্রতীক একটি কুয়ো
অথবা পুকুর। অন্তিম
সংস্কারের শেষে এর
প্রত্যেকটির জলে আলাদা
করে স্নান করে
তবে মন্দিরে ঢোকা
নিয়ম। এর জন্য
আলাদা লোক রয়েছে ,
যাদের কাজ হল
কুয়ো বা পুকুর
থেকে বালতি করে
জল তুলে তর্পণার্থীদের
মাথায় ঢেলে দেওয়া ।
এই নিয়মের কথা
জেনে আমাদের চক্ষুস্থির!
কি সর্বনাশ, একেই তো
সমুদ্রে ডুব দেবার পর
থেকেই ভিজে কাপড়ে
রয়েছি তার উপরে
আবার ২২ বালতি
জলে স্নান করতে
হলে নিমোনিয়া না - ই
হোক সর্দিকাশি যে
হবেই সে সম্পর্কে
সন্দেহ ছিল না।
তবু , এত দূর
এসে তো আর
পিছিয়ে যাওয়া যায়
না। তাই এটিকে
অ্যাডভেঞ্চার মনে করে
আমরা মন্দিরের ৭ - একড়
প্রাঙ্গনে পুরো ২২ টি
তীর্থ ঘুরে ৪৪ বালতি
জলে (দু জনে) স্নান
করে ফেললাম ।
তাতে প্রায় ৪৫
মিনিট সময় লাগলো ।
আমাদের মনের অবস্থা
তখন বনফুলের “জঙ্গম”- এর
মত -
“সমুদ্রে
পেতেছি শয্যা, শিশিরে
কি ভয়” । কিন্তু
আশ্চর্যের কথা এই
যে এত কিছুর
পরেও কারো এতটুকু
শরীর খারাপ হয়
নি। মন্দিরের লোকেরা
বলেছিল যে পুণ্যস্নানে
কারো নাকি শরীর
খারাপ হয় না।
হয়তো বা তাই।
তীর্থের জলে
স্নান করার সময়
একটুখানি জল খাওয়াও
নিয়ম। দেখে অবাক
হলাম যে প্রতিটি
তীর্থর জলই মিষ্টি,
সমুদ্রের এত কাছে
হওয়া সত্ত্বেও একটুও
নোনতা স্বাদ নেই।
শুনলাম প্রতি দিন
অজস্র বালতি জল
তোলা সত্ত্বেও তীর্থর
জল কখনও শেষ হয়
না বা
শুকিয়ে যায় না।
শেষ তীর্থের সামনে
ছেলে ও মেয়েদের
কাপড় বদলাবার দুটি
বিশাল ঘর, খুব
পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। অবশেষে
শুকনো জামা কাপড়
পরে এবার মন্দিরের
ভিতরে ঢুকলাম। এই
মন্দিরের গোপুরমও দেখার
মত। দ্রাবিড় স্থাপত্যের
অপূর্ব নিদর্শণ। এখানকার
বিশেষ দ্রষ্টব্য হল
মন্দিরের তিনটি দালান
বা করিডোর যাকে
এরা বলে “প্রকার”।
তার দু ধারে
অনবদ্য কারুকার্য্য করা
খিলানের সারী। ১ . ২
কিলোমিটার লম্বা এই
দালান পৃথিবীর সবচেয়ে
লম্বা pillared
corridor । দুর্ভাগ্যবশতঃ
সিকিউরিটির দরুণ এখন
মন্দির বা তার
ভিতরের ছবি তোলা
বারণ।
গেস্টহাউসে ফিরে
খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা
বেরিয়ে পড়লাম বাকী
দ্রষ্টব্য দেখতে। প্রথমেই
গন্ধমাদন পর্বত যার
উপর থেকে সারা
রামেশ্বরম দেখতে পাওয়া
যায়। পথে রয়েছে
কোদণ্ডরামা মন্দির। এইখানেই
বিভীষণ রাবণের পক্ষ
ছেড়ে প্রথম রামের কাছে
আত্মসমর্পণ করেছিলেন। লংকা বিজয়ের
পর এখানে রাম
বিভীষণকে লংকার অধীশ্বর
ঘোষণা করে তাঁর
রাজ্যাভিষেক করেন। গন্ধমাদন
পর্বতের উপরে মন্দির।
কিন্তু সেখানে কোন
বিগ্রহ নেই, শুধু
একটি চক্রের উপরে
দুটি চরণচিন্হ রয়েছে।
রাম যখন প্রথম
এখানে আসেন তখন
এই গন্ধমাদন পর্বতের
উপর থেকে কোথায়
সেতু বাঁধা হবে
সেটা ঠিক করেছিলেন।
পরে হনুমান যখন
রামের আংটি নিয়ে
লংকায় বন্দিনী সীতার
কাছে যান তখন ও
তিনি এখান থেকেই
যাত্রা শুরু করেছিলেন।
মন্দিরের ছাত
থেকে চারদিকের দৃশ্য
তুলনাহীন। চারদিকের গাছপালার
নিবীড় সবুজ এসে
মিলেছে সমুদ্রের গাঢ়
নীলিমার সঙ্গে। তার
মাঝে অতি আধুনিক
টিভি টাওয়ার এই
পরিবেশে কেমন খাপছাড়া
লাগে। অন্য দিকে
গাছপালার ফাঁকে চোখে
পড়ে বিরাট বড়
বালির চড়া। শুনলাম
সেখানটা নাকি ফিল্মের
শুটিং - এর জন্য বিশেষ
জনপ্রিয়।
আরো কয়েকটি
মন্দির যার সঙ্গে রামায়ণের
কাহিনী জড়িয়ে আছে
এর কছেই রয়েছে
। তার মধ্যে
একটি হল ভিলুণ্ডি তীর্থম্ । এটিও
একেবারে সমুদ্রের তীরে । ছোট একটি
মন্দিরের সঙ্গে একটি
সেতু যার শেষে
রয়েছে একটি কূয়ো ।
রাম যখন তাঁর
বানর সেনা সহ
সীতার খোঁজে এখানে
এসে পৌছলেন তখন
দেখলেন যে কোথাও
খাবার জল নেই
। এদিকে তাঁর
পুরো সেনানী তৃষ্ণায়
কাতর । রাম তখন
সমুদ্রের তীরে বাণ
মারলেন । তাই থেকেই এই কূয়োর
সৃষ্টি । সেই জলে
সবার পিপাসা মিটেছিল
। কূয়োটি পরে
নতুন করে বাঁধানো
হয় । সামান্য নোনতা
হলেও সেই জল
আজও খাওয়া যায় ।
আর আছে সৎচি
হনুমান মন্দির । এখানেই
নাকি হনুমান রামকে
লঙ্কার অশোকবনে সীতাকে
খুঁজে পাবার সুখবর দিয়েছিলেন ।
নিজের অভিজ্ঞান স্বরূপ যে মণি সীতা
রামকে দেবার জন্য হনুমানকে
দিয়েছিলেন সেটি হনুমান
এখানেই রামের হাতে
তুলে দেন । এ
ছাড়াও রয়েছে জটাতীর্থম। শিবের পূজো
করার আগে রাম এই পুকুরে
স্নান করে জটা
ধুয়ে শুদ্ধ হয়েছিলেন । আজও
এখানে বহু পুণ্যার্থী
ডুব দিতে আসে।
এই পথেই
পড়ে পঞ্চমুখী হনুমানের
মন্দির । ভাসমান যে
শিলা দিয়ে এখান
থেকে লঙ্কা যাবার
সেতু তৈরি হয়েছিল
তার একটি এই
মন্দিরে রাখা আছে ।
আর হনুমান এখানে
পঞ্চমুখী কেন তারও
কাহিনী রয়েছে ।
রাম আর রাবণের
যুদ্ধের সময় যখন
রাবণের একটি বিশেষ
বাণে রাম আর
লক্ষ্মণ অজ্ঞান হয়ে
যান তখন রাবণের
দলের অহিরাবণ তাঁদের
দুজনকে পাতালে নিয়ে
গিয়ে লুকিয়ে রাখেন ।
হনুমান তখন তাঁদের
খুঁজতে খুঁজতে পাতালে
পৌছে জানতে পারেন
যে যদি পাঁচ
দিকে রাখা পাঁচটি
প্রদীপ একই সঙ্গে নিভিয়ে
ফেলা যায় তবেই
অহিরাবণকে মেরে ফেলা
সম্ভব হবে । আর
রাম আর লক্ষ্মণ
জ্ঞানও ফিরে পাবেন
। তখন হনুমান
পাঁচটি মুখের অধিকারী
হলেন - একই সঙ্গে হনুমান, হায়াগ্রীব,
নৃসিংহ , গরুড় আর
বরাহস্বামীর রূপ নিয়ে তিনি
একই সঙ্গে একটি ফুঁ
দিয়ে সেই পাঁচটি
প্রদীপ নিভিয়ে দিলেন ।
অহিরাবণের মৃত্যু হল আর সঙ্গে
সঙ্গে রাম আর
লক্ষ্মণও জ্ঞান ফিরে পেলেন ।
হনুমান সেই থেকেই
পঞ্চমুখী রূপেও পূজিত
হন ।
এবার আমরা
রওনা হলাম ধনুষ্কোডির
পথে। রামেশ্বরম দ্বীপের
গঠন একটি শংখের
মতন। তার পূর্ব
প্রান্তে ধনুষ্কোডি। ধনুষ্কোডির
আকার একটি তীরের
মত - ১৮
কিমি লম্বা আর
মাত্র ১ কিমি
চওড়া - যা
গিয়ে মিশেছে দুটি
সাগরসঙ্গমে। এটির একদিকে শান্ত
বঙ্গোপসাগর, যার স্থানীয়
নাম মহাদধি , আর
অপর দিকে উত্তাল
ভারত মহসাগর , যার
স্থানীয় নাম রত্নাকরণ। লোকে বলে
ঠিক এখানেই নাকি
রাম তাঁর ধনুক
ঠেকিয়ে সেতুনির্মাণের জায়গাটি
চিহ্ণিত করেছিলেন। বিভীষণ
লংকার রাজা হবার
পর তিনি রামকে
এই সেতু ভেঙে ফেলার জন্য
প্রার্থনা জানান। রামের
ধনুকের একটি কোনার
স্পর্শে সেতু ভেঙে
চূরমার হয়ে যায়।
সেই থেকেই এই
জায়গার নাম হয়
ধনুষ্কোডি, অর্থাৎ ধনুকের দ্বারা
চূর্ণ। “কোডি” শব্দের মানে
শেষ বা চূর্ণ
হয়ে যাওয়া। আগে
লোকেরা এখানেও তর্পণ
করতে আসত। কিন্তু
১৯৬৪- র তুমূল সাইক্লোনে
পুরো ধনুষ্কোডি শহর
নিশ্চিহ্ণ হয়ে মুছে
যায়। আজ তাই
এটি একটি মৃত
শহর, ইংরেজীতে যাকে
ghost town বলে। জেলেদের
কয়েকটি কুঁড়েঘর আর
ভাঙা কয়েকটি ইমারত
ছাড়া আর কিছুই
অবশিষ্ট নেই । নির্জন
সৈকতের সৌন্দর্য্য অবশ্য
দেখার মত। এখানে
রূপোর মত পরিস্কার
আর ঝকমকে বালি
যা আমাদের দেশে
সত্যিই দুর্লভ।
এ বারে
ঘরে ফেরার পালা।
গভীর নীল সমুদ্রের
দিকে চেয়ে মনে হল
যে যদিও
রাম আর রামায়নের
নানা স্মৃতিতে আজও
রামেশ্বরমের আকাশ বাতাস
ভরে আছে , উত্তরকাণ্ডের
দুঃখ বা বিষাদের
ছাপ এখানে কোথাও
পড়ে নি। রাম
এখানে প্রথমবার বিরহবেদনায়
ব্যথিত চিত্তে এলেও
তারপর এসেছেন বিজয়ী
বীর বেশে। প্রথমে
প্রত্যাখ্যান করলেও পরে
অগ্নিস্নাতা সীতাকে গ্রহণ করেছেন
সানন্দে। তাঁর সঙ্গে
শিবের পূজো করেছেন , করেছেন যুগল
শিবলিঙ্গ স্থাপনা। তারপরে বিভীষণকে
স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করে
এখান থেকে সগর্বে,
সহর্ষে ফিরে গেছেন
স্বদেশ অযোধ্যায়, সীতা ,
লক্ষ্মণ আর হনুমানকে
সঙ্গে নিয়ে। সেই
আনন্দের রেশ আজও
ভরে আছে রামেশ্বরমের
আকাশে বাতাসে।
No comments:
Post a Comment