Friday, June 10, 2016

লেকের মাঝে ছোট্ট দ্বীপে






বিশাল লেকের মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপ লিণ্ডাও। লেকের এক দিকে   আল্পস্ পাহাড়। বাকি তিন দিক ছুঁয়ে আছে অস্ট্রিয়া, জার্মানী আর   সুইটজারল্যাণ্ড ।  একই   লেকের তিনটি নাম।  ই্ংরেজরা বলে  লেক কন্সট্যান্স। জার্মানরা আর সুইসরা  বলে   কন্সটান্জ। আর  অস্ট্রিয়ার লোকেরা এই লেককে বলে বোডেনসী।  লেকের উপর তিনটি দেশের দাবী থাকলেও লিণ্ডাও   জার্মানীর অংশ তার কারণ  এই  দ্বীপ জার্মানীর বাভারিয়া  প্রদেশের সঙ্গেই দুটি ব্রীজ দিয়ে যুক্ত।  তার একটি দিয়ে আমাদের ট্রেন ঢিমে তালে এগিয়ে চলছিল  লিণ্ডাওর উদ্দেশ্যে। শুনলাম এই ব্রীজটি ১৮৫৩ তে তৈরী হয়েছিল। জানলা দিয়ে চেয়ে দেখলাম বাইরে মেঘের ঘনঘটা। সেই অন্ধকারের  সঙ্গে মিশে লেকের জল  আরো কালো আর গভীর মনে হচ্ছিল।  অতল  বলতে  যা  বোঝায় ।  আমি  চলেছি  মিউনিখ  থেকে ।  মাস  খানেক  আগে  সেখানে  রিসার্চ স্কলারশিপে  এসেছি ।  আমার  স্বামী আসছেন  বার্ণ থেকে ।  লিণ্ডাওতে  উইক   এণ্ড কাটিয়ে  আমি  আবার  ফিরে   যাব   মিউনিখে  আর  তিনি  ফিরে  যাবেন  জেনিভায় ।   লিণ্ডাওতে  যে  আমার  জন্য  এক  বিরাট  চমক  অপেক্ষা  করে  আছে  সেটা  তখনও  জানতাম  না 


একটু  পরেই  আমাদের  ট্রেন  লিণ্ডাও  স্টেশনে  এসে  ঢুকলো । মনে  হল  ঠিক  যেন  কারো  সাজানো  গোছানো ড্রইং রুমে  এসে  ঢুকলাম    সামনেই  হ্যালোইন  উৎসব,  যা    ছোটরা  খুব  আনন্দ  আর  উৎসাহের  সঙ্গে  পালন  করে । মস্ত  বড়  কুমড়োর  খোলে  চোখমুখ  কেটে  তার  মধ্যে  মোমবাতি  জ্বেলে এক  ভৌতিক  পরিবেশ  তৈরী  করা  এই  উৎসবের  অঙ্গ ।  এখনও    দিন  দেরী  আছে । কিন্তু  চারদিকে  হ্যালোইনের  কুমড়ো  সাজানো ।  বসার  জন্য বেঞ্চগুলো  সোফার  মত  দেখতে ।  আর  চারিদিকে  টবে  সাজানো   ফুলের  বাহার ।  কে  বলবে যে  এটি   একটি  স্টেশনের  প্ল্যাটফর্ম! 

শুনেছিলাম  আমাদের  হোটেল  স্টেশনের  কাছেই    আমার  স্বামীর  ট্রেন  আরো  ঘন্টা  খানেক  পরে  আসার  কথা ।।  ভাবলাম  ইতিমধ্যে  হোটেলটা  খুঁজেই  দেখা  যাক ।  এমন  সময়  দেখি  আমার  এক  পুরোনো  বন্ধু  প্ল্যটফর্মের অন্য  দিক  থেকে  হাত  নাড়ছে ।  মার্থার স্বামী জার্মান  হলেও  সে  নিজে  অ্যামেরিকান ।   সে  কাছেরই  কোন  শহরে  থাকে  আর  স্কুলে  পড়ায় ।  আমরা   লিণ্ডাও  বেড়াতে  আসছি  শুনে  বলেছিল  যে  স্কুল  থেকে  ছুটি  পেলে  আমাদের  সঙ্গে  দেখা  করতে  আসবে ।   শুনলাম  সে   একটু   আগেই  এসে  পৌছেছে ।  মার্থাকে  দেখে  মনে  অনেকটা  ভরসা  পেলাম  কারণ  আমার  জার্মান খুবই  ভাঙা  ভাঙা ।  কিন্তু  মার্থা  মাতৃভাষার  মতই  জার্মান বলে । 

হোটেলের  নাম  শুনে  মার্থা  বলল,  “সেটা  তো  খুব  কাছেই ।  চলো,  তোমার  জিনিষপত্র রেখে  আবার  স্টেশনে  ফিরে  এলেই   হবে ।”  আমি   বললাম,  “সেই  ভাল ।  স্টেশনে  তো  সুন্দর  একটা  কাফে  আছে  দেখছি ।  আমার  স্বামীর  ট্রেনের  জন্য  অপেক্ষা  করতে  করতে  চা-ও  খেয়ে  নেওয়া  যাবে ।”  আমরা  সুটকেস সহ  হেঁটেই
 রওনা  হলাম  রোমান  যুগের  কবল্  করা  রাস্তা  দিয়ে।  একটু  আগেই  বৃষ্টি  হয়ে  গেছে  তাই  সরু  পথ  জলে  ভেজা  তখনও ।  পথের  দু  ধারে  বাগানওয়ালা  বাড়ি,  চার্চ,  মিউজিয়াম আর  পার্ক।  সেখানে  নানা  রঙের  ফুলের  মেলা । 

রিজার্ভেশন  আমার  স্বামীই বার্ণ  থেকে  করেছিলেন  । হোটেলে  পৌঁছে  আমাদের  রুম  নম্বর জিজ্ঞাসা  করতেই  রিসেপশনের   মহিলা  রেজিস্টার  দেখে  বললেন, “কই,   নামে  তো  কোন  রিজার্ভেশন  নেই ।”  আমি  তো  হতবাক ।  সে  আবার  কি  করে  সম্ভব? গতকাল  রাত্রেই  তো  তিনি  ফোনে  বললেন  যে  রিজার্ভেশন  কনফার্ম হয়ে  গেছে ।  রুম  নম্বরটাও বলেছিলেন ।  মার্থা  বলল,  “ভাল  করে  দেখুন । বার্ণ থেকে  করা ।”  তিনি  আবার  খাতা  খুলে বললেন,  “বার্ণ  থেকে  করা  কোন  রিজার্ভেশনই নেই ।”  আমি  এবার   রুম  নম্বরটা    বললাম ।  তিনি  আবার  দেখে  বললেন,  “ঐ   ঘরে  অন্য  লোকের  নামে  রিজার্ভেশন  রয়েছে  রবিবার   পর্যন্ত ।”

তাই  শুনে  আমার  মাথায়  বজ্রাঘাত ।  আমার  ফেরার  টিকিট  তো  সেই  রবিবার  দুপুরে ।    দুদিন  তাহলে  থাকবো  কোথায় ?  এত  শর্ট  নোটিসে  রিজার্ভেশনই  বা  পাব  কি  করে ?  আর  তিনিই  বা  গেলেন  কোথায় ?  তখন  মোবাইল  ফোন  সবে  চালু  হয়েছে,  বেশী  লোক  ব্যবহার  করত না    আমাদের  কাছেও  ছিল  না ।  আমি  বললাম,  “কি  হবে,  মার্থা ? আমরা  তো  কেউ  কাউকে  যোগাযোগও   করতে  পারব  না ।  তিনিও  বার্ণ  থেকে  বেরিয়ে  গেছেন  আর  আমি  মিউনিখ     থেকে ।”   মার্থা  বলল,   “চিন্তা  কোর  না,  আমি  দেখছি ।”   তারপর  সে  রিসেপশনিস্টকে  বলল,  “আমরা    রুমের   ভদ্রলোককে  জিজ্ঞাসা  করে  দেখছি  কি  ব্যাপার ।”   রিশেপশনিস্ট  বলল,  “তিনি  তো  এইমাত্র বেরিয়ে  গেলেন ।”
“বেশ,  তা  হলে  সে  ঘরের  চাবী  দিন । তিনি  না  ফেরা  পর্যন্ত আমরা  সেখানেই  অপেক্ষা  করছি ।”
“সে  কি  করে  হয় ?”
“আপনারা    ধরণের  গোলমাল  করলে    ছাড়া  আর  উপায়  কি ?”
“আপনারা  রিসেপশনে  বসুন  না ।”
“ তাতে   কোন   লাভ  হবে  না    হোটেলে  এত  লোক  আসা  যাওয়া  করছে,  আমরা  তাকে  চিনব  কি  করে ? আপনি  চাবীটা  দিন । এতে  আপনার  আপত্তি  থাকলে  আপনিও   আমাদের  সঙ্গে  এসে  বসুন ।”
মার্থাকে  যার  পর  নাই  নাছোড়বান্দা   দেখে   রিসেপশনিস্ট  গাঁই  গুঁই  করতে  করতে  চাবীটা  দিয়েই  দিল  শেষ  পর্যন্ত ।

আমরা  এবার  উপরে  গিয়ে  সেই  ঘরের  দরজা  খুললাম ।  খুলে  দেখি  সামনেই  আমার  স্বামীর সু্টকেস  আর  ব্যাগ  রাখা ।  চির  পরিচিত  দুটোই ।   আমি  স্বস্তির নিঃশ্বাস  ফেললাম !  মার্থা  জিজ্ঞাসা   করল , “সুটকেসের  মালিকটি  কোথায়  গেলেন ?  বাথরুমের  দরজা  তো  খোলা  দেখছি ।”   আমি  বললাম,  “নিশ্চয়ই  স্টেশনে  গেছেন ।  কিন্তু  রাস্তায় দেখতে  পেলাম  না  তো !  আমরাও  তো  স্টেশন  থেকেই  আসছি ।”  মার্থা  বলল,  “তুমি  ঘরেই  থাকো   আমি   গিয়ে  দেখছি ।   স্টেশন  যাবার  অন্য  রাস্তাও  আছে    আমি  তো  তোমায়  শর্টকার্ট দিয়ে  নিয়ে  এসেছি । আসল  রাস্তাটা অন্য  দিকে ।”  ততক্ষণে টেনশানে  আমার  অবস্থা   কাহিল । আমি  বললাম,  “সে-ই  ভাল ।” বারবার  ভাবছিলাম  মার্থা  না  থাকলে  কি  হত ।    রকম  ভাবে  আমি  তো  জোরই  করতে  পারতাম না ।   আর  ভাষাতেও  কুলোতো  না ।  ঘরের  মধ্যে  পায়চারী  করতে  করতে  হঠাৎ  জানলা  দিয়ে  দেখতে  পেলাম  মার্থা আর  আমার  স্বামী  গল্প  করতে  করতে  হোটেলের  দিকে  হেঁটে  আসছেন ।  যাক,  মার্থার  তাহলে  ওঁকে  খুঁজে  বের  করতে  অসুবিধা  হয়  নি !

ওঁরা  ঘরে  ঢোকার  পর  জানতে  পারলাম  রিসেপশনিস্ট  বলেছে  যে   সে  নাকি  ভুল  রেজিস্টার  দেখেছিল  সে  জন্য  দুঃখিত ।  আমার  স্বামী শেষ  পর্যন্ত অন্য ট্রেনে  আসার  দরুণ    ঘন্টা  দুয়েক  আগেই  পৌছে  গেছিলেন ।  তাই  আমাকে  আনতে  স্টেশনে  গিয়েছিলেন ।   সেখানে  গিয়ে  তিনি  ভুল  করে  মিউনিখ  থেকে  আসা  আগের  ট্রেনটি  অ্যাটেণ্ড  করে  দেখলেন  যে  আমি  তাতে  আসি   নি ।  তখন  মিউনিখে ফোন  করার  জন্য  তিনি  দোকানে   ঢুকেছিলেন  । ঠিক  তখনই  মার্থা আর  আমি  হোটেলে  ঢুকি ।   কাজেই  কারো  সঙ্গে  কারো  দেখা  হয়  নি ।  যাক  অবশেষে  সব  গোলমাল  মেটার  পর  আমার  স্বামী  বললেন,  “চল,  এবার  কোথাও  গিয়ে  ভাল  করে  কফি  আর  জলখাবার  খাওয়া  যাক । মার্থা,  জায়গাটা  তুমিই  ঠিক  কর ।”  মার্থা  বলল,   “লেকের  ধারেই  অনেক  খাবার  জায়গা  আছে ।   তার  যে  কোনটিতে  গেলেই  চলবে ।”

জিনিষপত্র  রেখে   আমরা  বেরিয়ে  পড়লাম  হালকা   বৃষ্টি  সত্বেও  আর  চলে  এলাম  লেকের  ধারে      একেবারে  জলের  কোল  ঘেঁষে  বহু  খাবার  জায়গা ।  মস্ত  বড়  সাদা  ছাতার   নীচে  ছোট  ছোট  টেবিল  পাতা । তারই  একটা  দখল   করে   আমরা  কফি  স্যাণ্ডুইচ  আর  কেকের  অর্ডার  দিলাম ।  জার্মানীর    কেকও  সুইস  কেকের  মতই  সুস্বাদু -   বাদাম   আর  ক্রীমে  মোড়া । দাম  একটু  বেশী  হলেও  রীতিমত  লোভনীয়।   খাওয়া  শেষ  হতে  হতে  সূর্য  প্রায়  ডুবুডুবু ।  মার্থা  এবার   বিদায়  নিয়ে  নিজের  শহরে  ফিরে  গেল ।  আমরা  তার  সঙ্গে  স্টেশনে  গিয়ে  তাকে  ট্রেনে  তুলে  দিলাম ।  মার্থা বলেছিল  যে  স্টেশনের  বাইরেই  টুরিস্ট  ইনফর্মেশন  সেন্টার  আছে  যেখানে  লিণ্ডাও  সম্পর্কে যাবতীয়  তথ্য  আর  ম্যাপও  পাওয়া  যায় ।  তাকে  ট্রেনে   তুলে  দেবার  পর  আমরা  আগে  টুরিস্ট  সেন্টারে গিয়ে  সেগুলো  নিয়ে  নিলাম ।  পরদিন  বেড়াবার  সময়  কাজে  লাগবে ।

 এবারে  এই  ছোট্ট দ্বীপ  ঘুরে  দেখার  পালা ।
প্রতিটি  দ্বীপেরই  তার  নিজস্ব বৈশিষ্ট  আর  সৌন্দর্য  থাকে ।  এত  বড়  বিশাল  লেকের  মাঝে  দ্বীপ এত  কাছ  থেকে  দেখার  সৌভাগ্য  এর  আগে  কখনও  হয়  নি ।  লিণ্ডাওর বন্দর  বা    হার্বার  এখানকার  প্রধান  দ্রষ্টব্য ।   লেকের  তীরকে  সবাই  মেরিনা  বলে ।  তার  একদিকে  একটি  বিরাট  সিংহের  স্ট্যাচু  নীরব  প্রহরীর  মত  দাঁড়িয়ে  আছে ।  অন্য  দিকে  বন্দরের   গেট   ঘেঁষে  একটি  লাইটহাউস  যার  উচ্চতা  ৩৩ মিটার ।  শুনলাম  জার্মানীর বাভারিয়া    অঞ্চলে  এটাই  নাকি  একমাত্র  লাইটহাউস । আর  এই  সিংহ  হল  বাভারিয়ার  অন্যতম  প্রতীক ।  বিখ্যাত  শিল্পী  জোহ্যান ভন  হলবিং - এর  এটি  অন্যতম  সৃষ্টি ।  টিকিট  কিনে  লাইটহাউসের  উপরে  ওঠা  যায় আর  উপর  থেকে  সারা  লিণ্ডাওর দৃশ্য  নাকি  অপূর্ব । কিন্তু  ততক্ষণে  সন্ধ্যার ছায়া  নেমে  এসেছে ।  আকাশেও  গাঢ়  মেঘ ।  আমরা  ঠিক করলাম   যে  পরদিন  সকালে  এসে  উপরে  ওঠা  যাবে ।  এই  বন্দরকে  সবাই   “নিউ  হার্বার”   বললেও  এটিও  তৈরী  হয়েছিল  ১৮৫৩  সালে,  রেলওয়ে  ব্রীজটির  সঙ্গে।


লেকের  পাশে  পাশে  সুন্দর  চলার  পথ । বহু  যুগ  আগে  আইস্  এজ- এ  রাইন  নদীর  গ্লেসিয়ার  বা  বরফের  স্তর  থেকে  এই  লেকের  জন্ম। ৬৩  কিমি  লম্বা  আর  ১৪  কিমি  চওড়া   এই  লেক  কন্সটান্জ দক্ষিণ  জার্মানীর  অনেক  শহরে  জল  সরবরাহ  করে    স্থানীয়   লোকেরা  এই  লেককে  বলে   সোয়াবিয়েনসী ।   এর  তিনটি  ভাগের  তিনটি  আলাদা  নাম ।  উপরের  ভাগকে  বলে  ওবারসী  বা  আপার  লেক  আর  নীচের  দিকটা  হল  উন্টারসী  বা  লোয়ার  লেক ।  এই  দুটিকে  জুড়ে  দিয়েছে  রাইন  নদী  যার  নাম  হল  সীয়ারহিন।  অনেকটা  আমাদের   নৈনিতালের   তল্লীতাল আর  মল্লীতালের  মত ।

লিণ্ডাওর  ইতিহাস  রীতিমত  চিত্তাকর্ষক। সেন্ট  গ্যালেনের  এক  পাদ্রী ৮৮২  খৃষ্টাব্দে  সর্বপ্রথম  লিণ্ডাওর  ঊল্লেখ  করেন  তাঁর  একটি  লেখায় ।  এই  দ্বীপের  সবচেয়ে  পুরোনো  চার্চ  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল  ১১৮০  সালে।  সেই  চার্চ  পরে  মোনাস্ট্রী  বা  মঠে   পরিণত   হয় ।    সম্রাট  রুডল্ফ- ১    লিণ্ডাও কে  তাঁর  রাজ্যকালে  ইম্পীরিয়াল  ফ্রী  সিটি  বলে  ঘোষণা  করেন ।  তার   অনেক  পরে,   বহু  চড়াও  উৎরাও  আর  ক্ষমতার  হাতবদলের  পর  অবশেষে  লিণ্ডাও  জার্মানীর বাভারিয়া  প্রদেশের  অংশে  পরিণত  হয়    


লেকের  পথ  ধরে  চলতে  চলতেই  মেঘ  সরে  গিয়ে  আকাশ  পরিস্কার  হয়ে  এল । ইউরোপে  এলে  এই  ক্ষণেক্ষণে মেঘ-রোদের  খেলা  বিশেষ  করে  ভাল  লাগে ।  আবহাওয়া  কখন  কি  রূপ  নেবে  আগে  থাকতে  বোঝার  উপায়  নেই ।  এবার  একে  একে  হার্বারের  আলো  জ্বলে  উঠলো ।   চারদিক  আলোয়  আলো ।  গাছ,  ফুল,  জল  আর  আকাশ সব  উৎসবে  মাতোয়ারা    মনে  হল  হঠাৎ  যেন  পরীদের  রাজ্যে এসে  পড়েছি    আলোর  ছোঁওয়া  লাগছে  সযত্নে  নতুন-করা  প্রাচীন  ইমারতের  দেওয়ালে।  বেশ  কয়েক  শতাব্দী  পিছিয়ে  গিয়ে  পুরো  পরিবেশটাই  যেন  পাল্টে  গেছে     আলো জ্বলছে  দূরে  লেকের  ফেরীনৌকোয় ।  মনে    হল  তারাও  যেন  বিগত  দিনের   যাত্রী ।  শুনেছিলাম  উনবিংশ  শতাব্দীর শেষ  পর্যন্ত  এখানে  নাইট  ওয়াচম্যান   থাকতো    অন্ধকার  রাত্রে  তারাই  সুরক্ষা  আর   নিরাপত্তার  ব্যবস্থা  করতো ।  এখনও  একজন   সে  যুগের  নাইট ওয়াচম্যান  সেজে  লাঠি  আর  শিঙে    নিয়ে  লন্ঠন  হাতে  টুরিস্টদের  রাত্রে  সারা  লিণ্ডাও  ঘুরিয়ে  আনে ।  ৯০- মিনিটের  কণ্ডাকটেড্  টুর  আর  কি ।   কিছুটা  পরিশ্রান্ত  বলে  আমরা  আর  তাদের  দলে  যোগ  দিলাম  না ।  খানিকক্ষণ  লেকের  ধারে  বসে  থেকে  হোটেলে  ফিরে  গেলাম।  সে  রাত্রে  হোটেলেই  হালকা    ডিনার  খেয়ে   নিলাম ।

পরদিন  সকালে  তাড়াতাড়ি  তৈরী  হয়ে,  ব্রেকফাস্ট  সেরে  বেরিয়ে  পড়লাম  দিনের  আলোয়  লিণ্ডাও  ঘুরে  দেখতে ।  প্রথমেই  হার্বার  আর  লাইটহাউস ।  তার  উপর  থেকে  লেক  আর  চারদিকের  দৃশ্য,  এক  কথায়  তুলনাহীন ।  এমনিতে  আমি  সচরাচর  মাথা  ঘোরার  ভয়ে  বেশী  উপরে  ওঠা  এড়িয়ে   চলি  কিন্তু এবারে  মনে  হল  যে  এখানে  না  উঠলে  একটা  বিশেষ  উপলব্ধি  থেকে  বঞ্চিত  হতাম । 

এবারে  আমরা  চললাম  পুরোনো  সিটি  সেন্টার  দেখতে ।  প্রাচীন  কালের   সরু  সরু  রা স্তা     ,  রোমান  যুগে  তৈরী  লম্বা  ধাঁচের   ইঁট  দিয়ে  বাঁধানো ।  পথের  দু  ধারে  নানা  ঐতিহাসিক  ইমারত  যার  বেশীর  ভাগই  সযত্নে  সুরক্ষিত ।  এরি  মধ্যে  রয়েছে  পুলভার্টাম আর  ডিবাস্টার্ম যা  প্রাচীন  লিণ্ডাও- র   নগর-প্রাচীরের  অংশ  ছিল । 

এবার  আমরা  এসে  পড়লাম  মার্কেটস্কোয়ারে     অতীত  থেকে  বর্তমানে     আজ  শনিবার,   হাটের  দিন  এখানে । দূরের  গ্রাম  আর  শহরতলী  থেকে  বহু  লোক  এসে  ভীড়  করেছে    নিজের  নিজের  পশরা  সাজিয়ে  বসেছে  সবাই ।  তাজা  ফল  আর  সবজী,  বাগান  থেকে  সদ্য তোলা । ডিম, মাখন, চীজ --  আরো  কত  কি ।  অন্য  দিকে  হাতে  বোনা  স্কার্ফ, সোয়েটার,  টুপী  আর  রকমারী  জামা  কাপড় । দ্রুত  লয়ে  বেচাকেনা  চলছে  আর  তার  সঙ্গে  দরাদরি ।  বেশীর  ভাগই  গ্রাম্য  জার্মান  ভাষায়।  ইংরেজী  বলার  বা  বোঝার  লোক  নেই  বললেই  হয় ।  অনেক  কষ্টে  ইশারা  ইঙ্গিতের  সাহায্যে  কয়েকটি  সুন্দর  স্কার্ফ   কিনে  ফেললাম ।  দরাদরি  না  করতে  পারলেও  এগুলোর  দাম  যে  দোকানে  অনেক  বেশী  হবে  তা  বুঝতে    দেরী  হয়  নি     আরো  দেখলাম  নানা  রকম  সুইস  নাইফ   রয়েছে  -  দোকানের  চেয়ে  অনেক  কম  দামে ।  তা  থেকেও  কয়েকটি  নিয়ে  নিলাম ।


মার্কেটপ্লেসের  পশ্চিম  দিকে  লেকের  ঠিক  গায়েই  একটি  অপূর্ব ইমারত  যার  নাম   Haus zum Cavazzen ।  এটি  বিখ্যাত মাস্টারবিল্ডার  গ্রুবেনমান ( Grubenmann) এর  তৈরী ১৭২৯ সালে ।  এখন  এটি   লিণ্ডাও  মিউজিয়াম  । শুনলাম  এটি  আগে  কারো  বাসগৃহ  ছিল । পরে  মিউজিয়াম এ  পরিণত    হয় ।  এখানে  বহু  রকমের    ফার্ণিচার  আর  আসবাবপত্র দেখতে  পেলাম - গথিক  থেকে  শুরু  করে  ব্যারোক স্টাইল  অবধি ।    ছাড়াও  রয়েছে নানা রকমারী  জিনিস রূপো,  ব্রঞ্জ তামা  পিতল আর  টিনের  তৈরী ।  কাঁচ  আর  সেরামিকের  নানা  সৌখীন  জিনিষের  সম্ভার ।  রকমারী  পুরোনো  দিনের  খেলনা । অপূর্ব  সব  পেন্টিং  আর  মূর্তি ।

এত  সব  দেখতে  দেখতে  অনেক  বেলা  হয়ে  গিয়েছিল ।  লাঞ্চের  জন্য  আমরা  খুঁজে  খুঁজে  ম্যাকডোনাল্ড-এ  গিয়ে  পৌছলাম। ইউরোপে  নানা  রকমের  খাবার  পাওয়া  যায়  কিন্তু  তার  স্বাদ  সম্পর্কে  সঠিক  ধারণা  না  থাকলে  সেই  অভিজ্ঞতা    সব  সময়  মুখরোচক  না - ও  হতে  পারে !  ম্যাকডনাল্ড চির  পরিচিত  কাজেই  সেখানে  টেনশনের  ব্যাপার  নেই  আর  দামও  অন্যান্য জায়গার  তুলনায়  সস্তা।  আইসক্রীমটা  বরং  বাইরে  খাওয়া  ঠিক  হল ।



তারপর  আবার  লেকের  ধারে    জলের  কাছ  ঘেঁষে  সুন্দর  বসার  জায়গা    অনেকেই  বসে  আছে    যারা  ওয়াটার  স্পোর্টস্  ভালবাসে  তাদের  লিণ্ডাও  খুবই  ভাল  লাগার  কথা  কারণ  এখানে  সাঁতার, বোটিং,  ইয়টিং,  সার্ফিং -  সব  কিছুরই  সুব্যবস্থা  আছে  দেখলাম ।  নৌকো  ভাড়া    করে  লেকে  বেড়ানো  যায় । তা ছাড়াও  রয়েছে  স্টিমলঞ্চে কণ্ডাক্টেড্  টুর   যা    মেরিনা  থেকেই  ছাড়ে    তাতে  একই  সঙ্গে  তিনটি  দেশ  -  জার্মানী,  অস্ট্রিয়া  আর  সুইটজারল্যাণ্ড -  বেড়িয়ে  আসা  যায় ।  শুনলাম  লিণ্ডাওতে  প্রতি  বছরই  নোবেল  লরিয়েটদের  মিটিং  থাকে ।  আলাপ  আলোচনার  পক্ষে  সত্যিই  আদর্শ  পরিবেশ  সেটা  স্বীকার করতেই  হল । 

বাকী    দিনটা  আমরা   এমনিই    বেড়িয়ে  কাটালাম ।  পথের  ধারে  অনেক  পুরোনো  চার্চ। তার    মধ্যে  কয়েকটিতে  নতুন  টাওয়ার  যোগ  করা  হয়েছে    সে  গুলো  যে  নব  নির্মিত  তা  দেখেই  বোঝা  যায়    এর  মধ্যে  সেন্ট  পীটার্স চার্চ ১০০০ বছরেরও  বেশী  পুরোনো ।  এই  চার্চের  দেওয়ালে  অনেকগুলো  পেন্টিং টাঙানো  আছে  বিখ্যাত  শিল্পী হান্স  হলবীনের (১৪৮০)   আঁকা ।  মজার  ব্যাপার  এই  যে  চার্চের  পাশেই  একটি  টাওয়ার  রয়েছে  যেটির  নাম  Thieves Tower ।
সন্ধ্যা হয়ে  গিয়েছিল ।  আমরা  আবার  ম্যাকডনাল্ডে   গিয়ে  ডিনার  সেরে  হোটেলে  ফিরলাম ।  ফিরে  দেখি  চারদিকে  পুলিশ , ঘরে  ঘরে  উঁকিঝুঁকি  মারছে ।  কি  ব্যাপার ?  জিজ্ঞাসা করে  জানতে  পারলাম  হোটেলের  এক  ভদ্রলোক হঠাৎ -ই  হার্ট অ্যাটাকে  মারা  গেছেন  একটু  আগে ।   এমন  কিছু  বয়েস  ছিল  না ।  সেদিন  সকালেই  তাকে ব্রেকফাস্ট টেবিলে  দেখেছি  মনে  পড়ল ।  মনটা  খারাপ  হয়ে  গেল ।  এই  তো  মানুষের  জীবন -  আজ  আছে  তো  কাল  নেই ।  কখন  যে  কি  হবে  তা  কেউ  বলতে  পারে  না   


 পরদিন  রবিবার ।  আমাদের  দুজনের  ট্রেনই  বিকেলে ।  আমারটা  আগে,  বিকল  চারটেয় ।  ওঁরটা  তার  আধ  ঘন্টা  পরে    ব্রেকফাস্টের  পর   আমরা  আবার  বেরিয়ে  পড়লাম  লেকের  ধারে    বেলা  দুটোর  সময়  চেক  আউট   করলেই  হবে  তাই  ফেরার  তাড়া  নেই    হার্বারের  পাশেই  বিখ্যাত  লিণ্ডাভিয়া  ফাউন্টেন,  লাল  মার্বেল  পাথরের  তৈরী ।  তার  পেছনে  রং-বেরং- এর  পাথরের  দেওয়াল ওয়ালা  পুরোনো  টাউন  হল ।  আগে  নাকি  এখানে  একটা  আঙুরের  ক্ষেত  ছিল ।  তারপর  ১৪২২  সালে  এখানে  টাউন  হলটি  তৈরী  হয় ।   ১৪৯৬-এ  এখানেই  Imperial Diet - এর   বিরাট  সভা  হয়েছিল ।  এখন  টাউন  হলের  এক  তলায়  বিশাল  লাইব্রেরী ।   সেখানে  ১৪ শতাব্দী থেকে  শুরু  করে  প্রায় ২৪  হাজার  বই  আর  পাণ্ডুলিপি  রয়েছে ।   এই  বাড়িতেই  লিণ্ডাওর  আরকাইভ  আর  সুন্দর  একটি  রিডিং  রুম  আছে ।   আবার  খোলা  রাস্তায়  বেরিয়ে  এলাম ।   একটু  পরে  পরেই  পার্ক ।  সেখানে  নানা  রঙের   ফুল  ফুটে  আছে    সবুজ  ঘাসে  প্রজাপতির    মেলা    দূর  থেকে  পাখিদের  কলরবও  ভেসে  আসছে । এমন  শান্ত আর  সু্ন্দর  পরিবেশ  কমই  চোখে  পড়ে ।   ব্রীজের  কাছে  গিয়ে  দেখলাম  পথের  দু  ধারে  নানা  রঙের  নিশান  উড়ছে । সম্ভবতঃ  কোন আন্তর্যাতিক সন্মেলনের জন্য । 

এবারে   মিউনিখে   ফেরার  পালা ।  লাঞ্চের পর   জিনিষপত্রসহ  চেক  আউট  করে    বেরিয়ে  পড়লাম  স্টেশনের  উদ্দেশ্যে ।   আমার  ট্রেন  আসার  সময়  হয়ে  গেছে     মনে  মনে  সুন্দরী  লিণ্ডাওকে  বিদায়     জানালাম      বেড়াতে  গিয়ে  বার  বার  নতুন  অভিজ্ঞতা  মন   ভরিয়ে   দেয় ।   প্রতিবারই  মনে  হয়,  “বিপুলা    পৃথিবীর  কতটুকু   জানি”  !

 স্বপ্না দত্ত

 ছবি : সৌজন্য  গুগল্  ইমেজেস্

প্রয়োজনীয়  তথ্য

কি  ভাবে  যাবেন
লিণ্ডাওর  সবচেয়ে  কাছের  এয়ারপোর্ট হল  জুরিখ ।  জার্মানী, সুইটজারল্যাণ্ড  অথবা  অস্ট্রিয়া  থেকে সহজেই  ট্রেনে  আসা  যায়। মিউনিখ  অথবা  স্টুটগার্ট  থেকে  প্রতি ২  ঘন্টা  অন্তর  ট্রেন  আছে।
বিশদ  জানতে  হলে  নীচের  ওয়েবসাইটে  দেখুন :

কোন  সময়ে  যাবেন
মে  থেকে  অক্টোবরের  মধ্যে  গেলেই  ভালো

কোথায়  থাকবেন
লিণ্ডাও ছোট  জায়গা  বলে  হোটেলের  দাম  একটু  বেশীরই  দিকে । তারি  মধ্যে  ভালো ডীল  পাবার  জন্য  নীচের  ওয়েবসাইটে  দেখুন:

খাবার  জায়গা